পৃথিবির প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় যেটি এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান তার প্রতিষ্ঠাতা একজন মহিলা

0
হিফজুর রহমান খাজাম: বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং জ্ঞান মুকুলিত করে নবম শতকের সাক্ষ্য বহন করে এক বিংশ শতকে পদার্পণ কারী পৃথিবীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়টি অক্সফোর্ড বা বলোগ্না নয় এটা হল মরক্কোর ফেস শহরে অবস্থিত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রায় 1000 বৎসর পূর্বে যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগে হাবুডুবু খাচ্ছিল বা টলমল করছিল ঠিক তখন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জ্ঞানের আলোকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আব্বাসীয় খেলাফতের যুগে তুর্কি থেকে মরক্কো উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত সার্বজনীনতার বিকিরণকারী আশার আলো উদ্রেককারী বিভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী একটি আশ্রয়স্থল ছিল মরক্কো।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার এই স্বর্ণযুগে একজন তরুণী মহিলা ফাতিমা আলফাহরি 859 ইংরেজিতে মরক্কোর ফেজ শহরে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন যার নাম হল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়। গিনেস বিশ্ব রেকর্ড, ম্যানচেস্টার প্রেস এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় হল একমাত্র প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় যা আজ পর্যন্ত মাথা উঁচু করে তার ঐতিহ্য বহনকরে চলেছে।
পৃথিবীর মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় যেমন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বলগনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় গুলি স্থাপিত হয়েছে দুই থেকে আট শতক পরে।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর অন্তর কারা উইন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিম্পোজিয়াম, বিতর্ক আয়োজন করা হতো। তৎসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে বা বাইরে জনসাধারণের জন্য গ্রন্থাগার উন্মুক্ত করে রাখা হতো।
আজ অবধি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা আছে। এখনো পর্যন্ত ফাতিমা আলফাহরির মূল ডিপ্লোমা টি কাঠের বোর্ডে সংরক্ষিত করে প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে। গর্বের সাথে এটাও বলা যায় যে বিভিন্ন বিষয়ের উপর চার হাজারেরও বেশি পান্ডুলিপি এখনও বহাল তবীয়তে আছে। চৌদ্দশ শতকের ঐতিহাসিক, বহুবিদ্যায় পন্ডিত ইবনে খালদুন এর পুথি বা বই গুলো এখনো বহাল আছে।
পরিতাপের বিষয় হলো শত শত বৎসর থেকে পুঞ্জিভূত থাকায় এই মূল্যবান পান্ডুলিপি গুলো ধ্বংস হতে শুরু হয়েছে যেগুলোর মধ্যে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত ইবনেখালদুনের লেখা পাণ্ডুলিপি ও আছে।
বর্তমান যুগে উচ্চশিক্ষা বলতে যে জিনিসটা বুঝায় সেই প্রত্যয় বা ধারণা নিয়ে ফাতিমা এই বিশ্ববিদ্যালয় কে স্থাপন করেছিলেন। আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে ফাতিমা আল ফাহরি এমন একটি জায়গা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন যেখানে উন্নত জ্ঞানের জন্য দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক মেধা গুলো একত্র হয়ে তাদের জ্ঞানকে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পারে যা তাঁর দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছিল। আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক নকশা তৈরী করেছিল যার ফলে ইউরোপ ও পরবর্তী দুই শতকের মধ্যে ইতিহাসের আরও দুইটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। যে উত্তরসূরি গুলি হল 1088 ইংরেজিতে স্থাপিত বলোগ্না বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরটি হলো 1096 ইংরেজিতে স্থাপিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
ফাতিমা আল ফাহরি 800 খ্রিস্টাব্দ তিউনিসিয়ায় এক সম্পদশালী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যায় বিশ্বাস করতেন।
ওই সময় তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি বওডেলসম্পত্তির মালিক হন। ঠিক সে সময় তিনি ফেজ শহরে উপস্থিত হন। বৈচিত্রময় বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের লোকেরা সেই সময়ে ফেজ শহরে বসবাস করত। শহরে পৌঁছে তার সম্পত্তির বড় একটি অংশ খরচ করে তিনি একটি মসজিদ ও একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। ইউনিভার্সিটি কমপ্লেক্সের ভিতরের প্রাচীন একটি ভবন হল ইউনিভার্সিটি মসজিদ। এই মসজিদের ইমাম আব্দুল মাজিদ আল মারদী আল জাজিরার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন “ফাতিমা আল ফারিহি এখনো পর্যন্ত মরক্কো বাসীর প্রেরণা, তিনি আরো বলেন ফাতিমা আলফাহরি এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যে ভবনটি বিজ্ঞানের আলোক সংকেত বহন করছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় হল আবিষ্কারের এক বসন্ত”।
ফাতিমা আল ফাহরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন 859 খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে। আল হাওয়ারা উপজাতির কাছ থেকে এক খন্ড জমি ক্রয় করে তিউনিসিয়ার তার জন্মস্থান কায়েরা-ওয়ান এর নাম দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করেন।
ইবনে রুশদের মত মুসলিম দার্শনিক ছাড়াও অন্যান্য ধর্মীও বিশ্বাসীরাও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন ইহুদি দার্শনিক মায়মনাইডস (Maimonides) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী প্রাক্তনী বা আলুমনি ছিলেন গার-বার্ড- অফ-আউরিলাক (Gerbert of Aurillac) যিনি পোপ ২য় সিলভিস্তার নামে পরিচিত তিনিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনি বা আলুমনি ছাত্রদের মধ্যে একজন। ঐতিহাসিকদের অনেকে মনে করেন যে তিনি ইউরোপে আরবি সংখ্যা প্রচলনকারী প্রথম ব্যক্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here