নুন আনতে পান্তা ফুরোক, তবু ‛হার বার – মোদী সরকার’….

0
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক সামাউল্লাহ মল্লিক (কলকাতা)

এইবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই রাহুল গান্ধীকে পরিপক্ক দেখালেও পাপ্পু ডাক নাম তিনি মুছে ফেলতে পারেননি। সোশ্যাল মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অনুমান বিজেপি ১০ বছর আগেই করে ফেলেছিল। সোশ্যাল সাইটের ‛পাপ্পু জোকস্’ রাহুলের গুরুগম্ভীর ছবি আপলোডই হতে দেয়নি। কাজে আসেনি যোগীর রাজ্যের সপা-বসপা জোটও। মোদীর পুনরায় ক্ষমতা দখল নিয়ে লিখছেন – সামাউল্লাহ মল্লিক

“কাকে ভোট দিয়েছেন এইবার?” “বিজেপিকে, আর কাকে দেবো?” এহেন রাজনৈতিক প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিলেন ধর্মতলার নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ফুটপাথে দুধের লস্যি বিক্রেতা মনোজ। তিনি যোগীর রাজ্যের বাসিন্দা। উত্তরপ্রদেশের ‛যাদব’ সম্প্রদায়ের অনেকেই বংশ পরম্পরায় দুধ বিক্রি করে আসছেন। কিন্তু বর্তমান ভারতের যা অবস্থা, আইটি ও আইআইএম ডিগ্রিধারী যুবকেরাও দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই নির্লজ্জ্ব হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম – “কোন জাতের আপনি?” “যাদব”। “যাদব হয়ে ভোট অখিলেশকে কেন দেননি?” “কি করেছে অখিলেশ? মুসলমানদের মাথায় বসিয়ে রেখেছে, আর এখন মায়াবতীর পায়ে গিয়ে পড়েছে!” আবারও প্রশ্ন করলাম, “বিগত পাঁচ বছরে বিজেপি সরকার কি করেছে? যোগী সরকারই বা কি করেছে? সেইজন্য তো রুজির সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গে এসে পড়ে আছেন? আর তাছাড়া মুসলমান আপনাদের কি ক্ষতি করেছে?” যুবক চুপ! দোকানে ৩-৪ জন যুবকের সঙ্গে একজন বৃদ্ধও ছিলেন। “কিছুই লাভ হয়নি ৫ বছরে। আপনিই বোঝান এদের।” তাল ঠুকলেন বৃদ্ধ। সুযোগ পেয়ে মুখ খুলল মনোজ। বলল, “৭০ বছর ধরে কংগ্রেস কি করেছে? নেহরু থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধী, সবাই শুধু মুসলমান-মুসলমান জপ করতে থেকেছে। কংগ্রেসের সবাই দুর্নীতিবাজ। মোদীকে আরও ৫ বছর সুযোগ দিয়ে দেখা যাক। অসুবিধা কি আছে? কি আর হবে? আগেও আমাদের জীবনে যা সমস্যা ছিল, এখনও সেই সমস্যায় থাকবে। নুন আনতে পান্তা ফুরোক, তবু বারবার চাই মোদী সরকার।” শেষ প্রশ্ন করলাম, “কিন্তু শুনেছি উত্তরপ্রদেশের গ্রামগঞ্জের মানুষেরা বিজেপির কাজে খুশি নয়? তারা নাকি বিজেপির উপর ক্ষিপ্ত?” অবাক উত্তর এলো – “ভোট মোদীকে দিয়েছি, বিজেপিকে না।”
এবারের লোকসভা নির্বাচনে সব ইস্যুর চেয়েও বড় ইস্যু ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। বিজেপি প্রেমী ভোটার ও মোদী প্রেমী ভক্তদের বড় কোষ্ঠকাঠিন্য ছিল মুসলিমদের নিয়ে। তার চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, উত্তরপ্রদেশে ‛দলিত’ মায়াবতীর সঙ্গে অখিলেশের জোট। দুই পার্টির জোট গঠনের সময় একজন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন যে, বহুজন সমাজ পার্টির সব ভোট ট্রান্সফার হয়ে সমাজবাদী পার্টির কাছে চলে যাবে। কিন্তু, সমাজবাদী পার্টির ভোট বহুজন সমাজবাদী পার্টির কাছে যাবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। যে সমস্ত লোকেরা নেহরু ও রাজীব গান্ধীর নাম লোকসভা নির্বাচনে নিয়ে আসার বিরোধিতা করছিলেন এবং ৭০ বনাম ৫ বছরের এজেন্ডাকে হালকাভাবে নিচ্ছিলেন, তাঁরা এই এজেন্ডার ক্ষমতা অনুমান করতে পারেননি। সোশ্যাল মিডিয়া এই এজেন্ডাকে সমাজের সবথেকে নিম্নস্তরের মানুষের কাছেও পৌঁছে দিয়েছিল। লস্যির দোকানের যুবকের মন্তব্য সেই কথা চিৎকার করে বলে দিচ্ছে।
বিজেপি ও তার সহযোগী দলের সাংসদদেরও এইবার একথা বুঝে নেওয়া উচিৎ যে, তাঁরা নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর জায়গায় নিয়ে আসেননি। বরং, মোদীই তাঁদের সংসদ ভবন পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। আমেঠির আকাশে ‛সুরাখ’ স্মৃতি ইরানি করেননি। ক্ষমতা ধরে পাথর ছোড়া ব্যক্তি কিন্তু সেই নরেন্দ্র মোদী। ‛আন্ডারকারেন্ট’ না, এটা সত্যিই সুনামি। এইবারের সুনামি আওয়াজহীন ছিল। যা বিরোধীরা অনুমানও করতে পারেননি। আইআইএমসির একজন ফেসবুক বন্ধু আছেন, তিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ভোট দেওয়ার পর একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‛উন্নয়নের জন্য ভোট দিয়ে এলাম।’ এখানে জাতি নিজের, দেশভক্তি নিজের এবং ধর্মও নিজের ছিল। বিহারে ভালো ফলাফল করতে তাই নীতিশের দল জেডিইউ-এর কোনও সমস্যায় হয়নি।
“কে জিতবে স্যার?” প্রশ্নটি করেছিলাম হাওড়ার সাঁকরাইল অঞ্চলের এক দোকানদারকে। গত সপ্তাহের কথা, যখন এক্সিট পোল নিয়ে দেশ এত উতলা হয়ে ওঠেনি। উত্তর এলো – “বোঝা যাচ্ছেনা ঠিক। তবে বিজেপি এইবার আসন কম পাবে।” “কেন মোদী জিতবেনা?” দোকানদার ভয়ঙ্করভাবে আশ্চর্যান্বিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল এবং বলল, “স্যার মোদীই আসা উচিৎ। দেশের ব্যাপার এটা। মোদীর মতো কোনও নেতা আছে? পাকিস্তানকে ঘরে গিয়ে মেরে এসেছে।”
আমজনতা দুর্বল সম্রাটকে পছন্দ করেনা। মোদী নিজেকে পরাক্রমী প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন। নির্বাচনের আগে মোদীর শ্লোগান ছিল, ‛নিজের আগে দেশ’। এটা শুধু একটা শ্লোগান ছিল না, মোদীর জন্য এটা ছিল একটা মাস্টার স্ট্রোক। জনতা এটাকে পছন্দও করেছে। বিজেপির রাজনীতিবীদদের এর কৃতিত্ব দেয়া উচিত এবং বিরোধীদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কিন্তু বড় সমস্যা হল, বিরোধী দলগুলি পরবর্তী নির্বাচনে বিজেপির গেমপ্ল্যান রিপিট করার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে বিজেপি নতুন গেমপ্ল্যান নিয়ে আরও এগিয়ে যায়। মহাজোটের উদাহরণ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ প্রণয় রায় আগেই বলে দিয়েছিলেন, “প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যত প্রচার করবেন, মোদীর হাত তত শক্তিশালী হবে। কংগ্রেস এখনও সত্তরের দশকে পড়ে আছে।”
আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, আজকাল গ্রামের লোকেরাও টিকটক নিয়ে খুব মেতে আছে। তাঁরা টিকটক ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করছেন, হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করছেন। স্মার্টফোনের কার্যকারিতা বিরোধীরা বুঝে উঠতে পারেনি। কংগ্রেসের ‛অসাধারণ’ ম্যানিফেস্ট ঠান্ডা বাক্সে বন্দি হয়েই থেকে গেল। বিজেপি সোশ্যাল সাইট ও টেলিভিশনের গুরুত্ব বুঝেছিল এবং তার যথাযথ ব্যবহারও করেছে। ক্যামেরার ‛রাডার’-এর সামনে মোদী ও ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ এর ছবি ধরা পড়া ছিল আরও একটি মাস্টার স্ট্রোক। মোদী ভালো করেই জানতেন যে, একটি ছবি হাজার শব্দের সমান। দীর্ঘ বক্তব্যের চেয়ে একটি ছবির গুরুত্ব অনেক। সে হোক মায়ের সঙ্গে দেখা করা, আর হোক অমরনাথ যাত্রা। মোদী ছবির মাধ্যমে ‛লার্জর দেন লাইফ’ এর ছবি বানিয়ে ফেলেছেন। অক্ষয় কুমারের ‛আম চোষা’ ‛অরাজনৈতিক’ সাক্ষাৎকারও এই ধারাবাহিকতারই অংশ। একদিকে ভক্তরা পছন্দ করছিল, অন্যদিকে সমালোচকরা রাগান্বিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিল না। আরও একটা মারাত্মক মাস্টার স্ট্রোক ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিশেষ করে হোয়্যাটসেপে মুলায়ম সিংকে ‛মুল্লা’য়ম সিং বলার ফলাফল একদিনে পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে জনগনের রক্তের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এসব বিষয়ে মোদীজির বরাবর চুপ থাকা ছিল আরও একটি মাস্টার স্ট্রোক।
এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল টেলিভিশনে ‛মাথাগরম’ প্রচার। বিগত তিন বছর ধরে পার্টির মুখপাত্র, রিপোর্টার, অনুষ্ঠান পরিচালক চিৎকার করছিলেন, এসব কি হওয়ায় উড়ে গেল? এসমস্ত কাজগুলো দূরদর্শী প্ল্যানিং হিসেবে করা হচ্ছিল। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ ছাড়াও বিজেপির জয়ের অন্যতম কারিগর হলেন সম্বিত পাত্র। সম্বিত টিভিতে বসে ধারাবাহিকভাবে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, হিন্দু-মুসলমান, রাম জন্মভূমি ইত্যাদি জনমনে ঢুকিয়ে গিয়েছেন। সবথেকে বড় কথা হল মুসলিম বিদ্বেষ। দেশের হিন্দুদের মনে এই ধারনা তৈরি হয়েছিল যে, হিন্দু ধর্ম বিপদে রয়েছে। তাই দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত যোগদানের কথা দেশবাসী দিব্যি ভুলে গেল। স্বাধীনতার লড়াইয়ে শহীদ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম, আর শেষে এসে এক গুজরাতি সব কৃতিত্ব দখল করে নিয়ে গেল একটি সিনেমার মাধ্যমে এবং দেশকেও দ্বিধাবিভক্ত করে দিল। এই চিন্তাধারাই সাধ্বী প্রজ্ঞাকে সংসদে পৌঁছে দিল এবং দিল্লিতে সরকারি স্কুলের নতুন ছবি ফুটিয়ে তোলা অতিশীকে দেখিয়ে গেল বুড়ো আঙুল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here