ব্যাঙ্কিং পরিষেবা নিয়ে দুটি কথা

0
ছবি : ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস
শরীফ আহমদ

চেকবুক ডেলিভারি হয়নি। অফিসে ছিলাম না তাই ক্যুরিয়ার‌ওয়ালা ফেরত নিয়ে গেছে। ব্যাঙ্ক থেকে কল এলো যাতে নিকটতম শাখা থেকে সংগ্রহ করতে পারি। অফিস থেকে সাতশো মিটারের বেশি হবে না আল কোসায়েস ব্রাঞ্চ। জোহরের পর পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম। ঝা চকচকে অত্যাধুনিক ব্যাঙ্ক বিল্ডিং। ফাইভ স্টার হোটেলের মতো ওয়েলকাম এরিয়া। ইউএইর সরকারি এমিরেটস ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অব দুবাই, সংক্ষেপে ই‌এনবিডি। ব্রিটিশ মহিলা এগিয়ে বসতে বললেন আর কেন এসেছি জেনে মেশিন থেকে একখানা কুপন এনে দিলেন। নম্বর B – 11। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন আমাকে হয়তো পাঁচ ছয় মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।

নীল সোফায় বসে আছি। সামনে এল‌ইডি স্ক্রিনে ব্যাঙ্কের বিভিন্ন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন সহ বারবার ভেসে উঠছিল অভিযোগ করার পদ্ধতি ও সমাধানের সময় সহ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম। উর্দি পরা ফিলিপিনো ছেলে হাঁসি মুখে ঠান্ডা এক গ্লাস জল দিয়ে গেলো। তৃষ্ণা ছিলনা কিন্তু পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসে ফটিকের মতো জল দেখে খেয়েই নিলাম। আমার এই একাউন্টে কেবল বেতনের টাকাই জমা হয়। এরপর আমি অনলাইনে বাড়িতে প্রয়োজনীয় টাকা পাঠিয়ে দেই। বাকিটা একাউন্টে‌ই পড়ে থাকে। কিছু কিনতে হলে ডেবিট কার্ড বা বিনামূল্যে দেয়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করি। মাসের শেষে যা বিল হয় অনলাইনেই পরিশোধ হয়। চ্যাক ব‌ইয়ের আমার খুব একটা দরকার নেই। তবুও ইচ্ছে করে নিচ্ছি। কখন দরকার হয় কে জানে। আমার একাউন্ট এমনকি এখানকার বেশিরভাগ লোক সুদহীন একাউন্ট ব্যবহার করে। কোন চার্জ নেই আবার ইন্টারেস্ট‌ও নেই।

চোখ বুজে বসে আছি, মনে পড়ে গেল আমাদের করিমগঞ্জের স্টেট ব্যাংকের কথা। জেলা সদরে দুটো ব্রাঞ্চ আছে। একটা নৈশকালীন তাই সাধারণ মানুষের জন্য মেইন রোডে অবস্থিত শাখাই একমাত্র ভরসা। পুরনো দুতলার বিল্ডিং। হাজার হাজার গ্রাহক। সকালে ব্যাঙ্ক খুলার আগে থেকেই লাইন শুরু হয়ে যায়। বিকেল চারটে অবধি লাগাতার ভীড় থাকবেই। সেই কলেজ জীবন থেকে দেখে আসছি জরাজীর্ণ বিল্ডিংয়ের সবসময় কোনো না কোনো মেরামতের কাজ চলছে। গ্রাহকদের তুলনায় কর্মচারী সবসময় কম। ছোট ছোট কারণে কর্মীরা অনায়াসে ধমক দেবে গ্রাহকদেরকে এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। লুঙ্গি পরা গেঁয়ো কেউ হলে তাচ্ছিল্য থাকবেই। তবে হ্যাঁ, খুব কম হলেও সব কর্মচারী এমন নন।

চার পাঁচ বছর আগে মা কে নিয়ে গেছিলাম পেনশনের লাইফ সার্টিফিকেট বানানোর জন্য। অনেকক্ষণ বসতে হচ্ছে। অফিসার আসেন নি। মা বললেন বাথরুমে যাবেন। এক সাফাই কর্মচারী মহিলাকে খুঁজে বের করলাম। জিজ্ঞেস করলাম মহিলাদের বাথরুম কোথায়? হিন্দিভাষী সাফাই কর্মী মহিলা চটে লাল! সোজা বললেন বাড়ি থেকে কেন এসব শেষ করে আসা হয়নি! আমার মাথা খারাপ। এ তো চুড়ান্ত অভদ্রতা! পুরুষ হলে দু চারটে কথা শুনিয়ে দিতাম কিন্তু চুপ করলাম। স্পষ্ট ভাষায় আবার বললাম, এক্ষুনি মহিলাদের নির্ধারিত বাথরুমের তালা খুলে পরিষ্কার করে দাও ন‌ইলে কমপ্লেন করব। মহিলাটি হেসে উঠলেন, যেন আমি কৌতুক করছি। ঠোঁট কামড়ে কোনোমতে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে দুতলায় ম্যানেজারের কেবিনে গেলাম। ভদ্রলোক ব্যস্ত। চারপাশে গ্রাহকরা ভীড় করে আছে। আমার পালা এলো। ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে ঐ সাফাই কর্মী মহিলার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল কমপ্লেন করতে চাই। হেড অফিসের ইমেইল, ফোন নম্বর ও ঐ মহিলার নাম জানতে চেয়ে পকেট থেকে কলম আর নোটবই বের করলাম। ম্যানেজার বুঝতে পেরেছেন বিষয়টি উপরে যাবে আর। আমাকে শান্ত হতে বলে ভদ্রমহিলাকে ডেকে পাঠালেন। কড়া ভাষায় ধমক দিয়ে বললেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন বাথরুম পরিষ্কার করে খুলে দেয়া হয়। মহিলা কর্মী অপমানিত হয়ে কেঁদে ফেললো। তারপর ম্যানেজার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন। কথামত কাজ। আমিও বিষয়টি ছেড়ে দিলাম।

এরকম কিচ্ছু হতো না যদি আমি প্রতিবাদ করতাম না। গ্রাহকদের অধিকার ব্যাঙ্ক সহ সব সরকারি দফতরে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে। অপমানসূচক কিছু হলেই প্রপার চ্যানেলে অভিযোগ করা চাই। গ্রামাঞ্চলের সহজ সরল গ্রাহকদের অনেকেই ব্যাঙ্ক কর্মিদেরকে ভগবান মেনে চলেন। হয়তো ভাবেন ওদের দয়ার উপরেই টিকে আছে পরিষেবা। এটা ভুল। অসুবিধা হলেই, অপমানজনক কিছু হলেই সোজা ম্যানেজারের কাছে ছুটে যান। বেশিরভাগ ম্যানেজার উচ্চশিক্ষিত ও বিবেকবান থাকেন। সমস্যা বুঝেন। এর পর‌ও যদি অভিযোগের ন্যায্য সুরাহা নাহয় তবে কারুর সাহায্য নিয়ে ব্যাঙ্কের বা ঐ সরকারি কার্যালয়ের হেড অফিসে অভিযোগ পাঠান। এই একটু কষ্ট গ্রাহক সেবার মানদন্ড উন্নিত করবেই। আর হ্যাঁ, ব্যাঙ্ক কর্মিদেরকে স্যার বলার কোনো প্রয়োজন নেই। গ্রাহকরাই তো আসল ‘স্যার’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here