নামহীনদের বলছি, যেভাবেই হোক পুনরাবেদন নথিভুক্ত করুন

0

বাসব রায়, গুয়াহাটি

এনআরসি-র চূড়ান্ত খসড়া তালিকায় নামহীন ৪০ লক্ষ মানুষ। অর্থাৎ যাঁরা নাগরিকপঞ্জি নবায়নের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং যাঁদের নাম ওঠেনি, সেই সংখ্যাটাই ৪০ লক্ষ। এই পর্যন্ত সবাই জানেন, গোটা ভারত জানে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, তিনসুকিয়ার অধ্যাপক সুশান্ত কর, আইনজীবী শিশির দে, রাজনীতিক হাফিজ রশিদ চৌধুরী, সাংবাদিক বীরেশ্বর দাস, চিন্তক-গায়ক শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার, সমাজকর্মী উজ্জ্বল ভৌমিকরা এনিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কথা বলেছেন। অসমের মোট জনসংখ্যা সোয়া তিন কোটি। সেখানে ৪০ লক্ষ মানুষ নামহীন থাকলে সত্যিই ভাবার মতো বিষয়।

চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশের পর প্রায় গোটা ভারত জুড়েই হইচই হয়েছিল। সেই সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিটি সংবাদপত্র, নিউজ চ্যানেলে বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকদিন টক শো, ডিসকাশান হয়েছে, হয়েছে সর্বভারতীয় চ্যানেলেও, পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, বাংলাদেশের সংবাদপত্রেও খবর, এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা নিউজ চ্যানেলেও অসম সম্পর্কে অনভিজ্ঞরা কথা বলেছেন, দেখেছি-শুনেছি।

যাঁরা নামহীন, পুনরাবেদন করতে পারবেন ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবং এখন পর্যন্ত যা খবর তাতে মাত্র ৭ লক্ষ নামহীন পুনরাবেদন করেছেন। আশা করা যায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, এক্ষেত্রে ১৫ ডিসেম্বর, প্রত্যেক নামহীন পুনরাবেদন করবেন। এবং যা বলার, এই আশা দুরাশা। যাঁদের নাম চূড়ান্ত খসড়া তালিকায় নেই, তাঁরা সবাই জানেন যে কেন নাম নেই। অর্থাৎ তাঁদের নথি এনআরসি-র নিয়মানুযায়ী ঠিকঠাক হয়নি। এবং কেন নাম ওঠেনি, এটা তাঁরা নিজেরা বুঝেছেন, এমন নয়, এনআরসি সেবাকেন্দ্র থেকে তাঁদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

পরিস্থিতি এখন যে জায়গায় তা হল, যে কারণে বা যে নথির অভাবে নাম ওঠেনি, সেই নথি জোগাড় করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন নামহীনরা, আর তাই তাঁরা পুনরাবেদন করছেন না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট থেকে বলা হয়েছে, নামহীনরা সবাই পুনরাবেদন করতে পারবেন, এমনকি নতুন কোনো নথি-প্রমাণপত্র পেশ করারও দরকার নেই, শুধু তাঁদের একটি আবেদন করতে হবে যে ‘আমি যেসব নথি-প্রমাণপত্র আগে জমা দিয়েছি, তা পুনর্বিবেচনা করা হোক’। শুধু উদ্ধৃত বাক্য লিখে আবেদন করলেই তাঁর পুনরাবেদন গ্রহণযোগ্য।

এবং এখানেই আসল খেলাটা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখছি যে এনআরসি সেবাকেন্দ্রের কর্মীরা এই আবেদনের ভিত্তিতে পুনরাবেদন গ্রহণ করছেন না। এবং গ্রহণ করবেন না, এটা লিখেও দিচ্ছেন না, বলা ভালো, যেভাবেই হোক নামহীনরা কিছুতেই যাতে পুনরাবেদন ‘রেকর্ড’ করতে না-পারেন, সেই চেষ্টাই চলছে অসমজুড়ে। হ্যাঁ, অসমজুড়ে।

কেন নাম নেই, এই উত্তরে এনআরসি সেবাকেন্দ্র থেকে বেশকিছু কারণ জানানো হয়েছে। কারো ক্ষেত্রে ‘লিংক সার্টিফিকেট ঠিক নয়’, কারো ক্ষেত্রে ‘পূর্বপুরুষের নাম মেলেনি’ এবং কারো ক্ষেত্রে ‘ডি-ভোটার’ বলা হয়েছে। যাঁদের লিংক সার্টিফিকেট বা পূর্বপুরুষের নাম-এর সমস্যা, তাঁরা তো বটেই, এমনকি এনআরসি থেকে যাঁদের ‘ডি-ভোটার’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁরাও পুনরাবেদন করতে পারেন। কেননা ভোটার তালিকায় তাঁদের নামের পাশে ‘ডি’ চিহ্ন নেই। এনআরসি কাউকে ডি-ভোটার বলতে পারে না, সেই ক্ষমতা বা অধিকার তাদের দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।

অথচ যাঁরা নামহীন, চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য পুনরাবেদন করতেই হবে। তার পরও যদি নাম না-ওঠে তালিকায়, সেক্ষেত্রে রয়েছে ট্রাইবুনালে যাওয়ার পথ। সেখানেও বিফল হলে হাইকোর্ট এবং তারপর সুপ্রিম কোর্টের দরজা। কিন্তু পুনরাবেদন না করলে পরবর্তী রাস্তা বন্ধ। হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট দূরের কথা, পুনরাবেদন না করলে ট্রাইবুনালেই কেউ যেতে পারবেন না। এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রায় ২০ লক্ষ পুনরাবেদনই করবেন না, এবং এই জায়গাতেই জোরদার প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-এবং জরুরি।

যেভাবেই হোক, পুনারবেদন করুন। এই প্রচারে জোর দেওয়া উচিত ছিল সরকারের। তিন বছর আগে সরকার জোরদার প্রচার চালিয়েছিল, যেভাবেই হোক এনআরসি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করুন, সফল করুন নাগরিকপঞ্জি নবায়ন প্রক্রিয়াকে। প্রায় প্রত্যেক অসমবাসী সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ‘যেভাবেই হোক পুনরাবেদন জমা দিন’ এই প্রচারে সরকারের যেন আগ্রহই নেই।

এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকায় কারো নাম না-উঠলেই তিনি বিদেশি হয়ে যাবেন, এমন কিন্তু নয়। শুধু এটা বলা যায়, ওই তালিকায়, যা প্রকাশিতব্য, নাম থাকলে তিনি ভারতের বৈধ নাগরিক। মাত্র এটুকুই, এর বেশি বা কম কিছু নয়। কেননা এনআরসি প্রক্রিয়া কোয়াসি জুডিশিয়ারি প্রক্রিয়া। এটা আদালত নয় যে কাউকে বিদেশি ঘোষণা করার অধিকার বা ক্ষমতা থাকবে।
জানি না, এই লেখা কাউকে পুনরাবেদনে উদ্বুদ্ধ করবে কি না, কিন্তু আমাদের লিখে যেতে হবে। সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here