ইসলামী সমাজতন্ত্রের রূপরেখা

0
সাধারণত সমাজতন্ত্র কথাটি মার্ক্সবাদী মতাদর্শের সাথে যুক্ত করা হয়। মার্ক্সীয় দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব‍্যবস্থা হচ্ছে এর চুড়ান্ত রূপ। এ ব‍্যবস্থা কোথাও অভিপ্রেত সাফল্য লাভ করতে পারেনি। কোথাও গণতন্র, কোথাও একনায়কত্ব, কোথাও সাম্রাজ‍্যবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। ষাট সত্তর বছরের অভিজ্ঞতায় সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্ববাসীর কৌতূহল শুধু কিছু সাংগঠনিক স্ত‍রে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে পূঁজিবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে দাঁড়ানো সমাজতন্ত্র এখন পূঁজিবাদী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র ছাড়াও অন‍্যান‍্য মতাদর্শও এক একটি সমাজতান্ত্রিক ধারণা উপস্থাপন করে। আমরা এখানে ইসলামী সমাজতন্ত্রের কিছু স্বরূপ আলোচনা করবো।
‘ধর্ম ব‍্যক্তিগত বিষয়’– ইসলাম এ ধারণাকে স্বীকার করেনা। বরং এক পরিপূর্ণ সামাজিক জীবনবিধান রূপেই ইসলাম নিজেকে তুলে ধরে। হাদীসে বলা হয়েছে: তোমাদের কোন তিনজন ব‍্যক্তিও যদি কোন এলাকায় বসবাস করে এবং একজনকে নেতা নির্বাচন ক‍রেনা তাহলে তোমাদের জীবন যাপন বৈধ হবেনা। অর্থাৎ ন‍্যুনতম তিনজন লোক হলেও পারষ্পরিক স্বার্থরক্ষা ও দায়িত্বশীলতার নিয়মে জীবন যাপন ক‍রতে হবে।
এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে হজরত উমর রাঃ বলেন: সমাজবদ্ধতা ছাড়া ইসলাম নেই, নেতৃত্ব ছাড়া সমাজবদ্ধতা নেই এবং আনুগত‍্য ছাড়া নেতৃত্ব নেই।
সুতরাং মুসলিমদেরকে সমাজবদ্ধ, সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে হবে। যেখানেই কিছু মুসলিম বসবাস করবে সেখানে একটি মসজিদ তৈরী করতে হবে। রসুলুল্লাহ সঃ মদীনাতে গিয়ে প্রথমেই মসজিদ তৈরী করলেন। মসজিদই সমাজ জীবনের কেন্দ্র। ইমামই সমাজের নেতা। পরামর্শের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনা করবেন। লোকেরা রোজ পাঁচবার করে নামাজে জমা হবে। কেউ না এলে কেন এলোনা, কি অসুবিধে তা দেখা হবে। সন্মিলিতভাবে অসুবিধে দূর করা হবে। “কেউ খাবে কেউ খাবেনা, তা হবেনা তা হবেনা” বলে ইসলাম স্লগান দিয়ে মঞ্চ উত্তাল করেনা, আর ভুখাদেরকে সর্বহারার বিপ্লব সফল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে দেয়না। বরং ভুখাতুরের সমস্যা নগদ সমাধানের জন্য নামাজীদেরকে যাকাত ও নানা ধরণের দান নিয়ে এগিয়ে আসতে বলে। এভাবে গরীব, অনাথ, ঋনগ্রস্থ, বিপদগ্রস্থ্, অসুস্থ, মুসাফিরদের সমস‍্যা সমাধান করে সমাজবদ্ধতার দাবী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি শান্তিকামী অমুসলিমদেরকে এই মূল ফাণ্ডে অংশীদার করে একটি সমভাগ তাদের জন‍্য নির্ধারিত করা হয়েছে। কুরআনের ভাষায় তাদের নাম দেয়া হয়েছে ‘মুআল্লিফাতু ফি ক্বুলুবিহিম’- সৌহার্দ‍্যের প্রত‍্যাশী।
এছাড়া সমাজের লোকদের পারষ্পরিক সমস্যা সমাধান, অপরাধ রোধ, উন্নয়নমূলক কাজ, শিক্ষা, ব‍্যবসা, কর্ম সংস্থান, এমনকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও সামাজিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব।
একটি সমাজ যদি এক দেহ হয়ে কাজ করে, তাহলে গরীবের মেধাবী ছেলেমেয়ের কোন সমস্যা হতে পারেনা। কোন বেকার ছেলের চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, অবৈধ পথে উপার্জন বা রাজনৈতিক দালালির পথে অগ্রসর হবার প্রয়োজন পড়েনা।
সবাই যদি সমাজের নজরে থাকে তাহলে সমাজে হিংসা বিদ্বেষ সন্ত্রাসী কার্য্যকলাপ জন্ম নিতে পারেনা।
মুসলিম সমাজের সর্বত্র যদি এই ধরণের চেতনা ও কার্যক্রম শুরু হয় তাহলে এক সর্বাত্বক সমাজবিপ্লবের জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। সমস্ত স্থানীয় সমাজ যদি প্রত‍্যেক বাসিন্দকে পরিচয়পত্র প্রদান করে তাহলে দেশের যেকোন স্থানে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব‍্যবসা, ভ্রমণে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়ে উঠবে।
প্রশ্ন তো হবেই যে, সমস্ত বিশ্বমুসলিম এক একটি স্থানীয় মসজিদ মহল্লা নিয়ে তো আছেই। মসজিদ কেন্দ্রিক স্থানীয় মহল্লার সাথে সম্পৃক্ত ছাড়া কোন মুসলিম নেই বললেই চলে। তার পরেও উপরে আলোচিত কোন উপকারই কেন কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা? ইসলামী সমাজব‍্যবস্থার কোন অস্তিত্বই কেন দেখা যাচ্ছেনা? কেন মুসলিম সমাজ হাজার সমস‍্যায় ধুকছে এবং চিন্তাশীলরা ইসলামের ব‍্যাপারে নিরাশ হয়ে অন‍্যান‍্য তন্ত্রের মধ‍্যে সমাধান সন্ধান করছেন?
এসব প্রশ্নের প্রথম ও শেষ জবাব হচ্ছে যে বিশ্বমুসলিম ইসলামী সমাজব‍্যবস্থার ধারণাটিই হারিয়ে ফেলেছে। মসজিদকে কেবল নামাজ ‘পড়ার’ জায়গা বানানো হয়েছে। ইমামকে বানানো হয়েছে ‘নামাজ পড়ানোর কর্মচারী’। এ নামাজে প্রাণ নেই, এ ইমামতে নেতৃত্ব নেই। এমনকি সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে আমরা সমস্ত বিশ্বমুসলিম যে ইসলাম ধর্ম পালন করছি, কুরআন সুন্নাতে যে ইসলাম বলা হয়েছে আমরা সে ইসলাম পালন করছিনা। আমার দুই দশক পূর্বে লেখা পুস্তিকার ভাষায় “এ ইসলাম সে ইসলাম নয়।”
আমাদের সবার অভিজ্ঞতা আছে, পাড়ায় একটি ক্লাব গড়তে সমাজের সেবা ও উন্নতিমূলক বিশাল বৈপ্লবিক লক্ষ‍্য উদ্দেশ্য নিয়ে সুচিন্তিত সংবিধান রচনা করে যাত্রা শুরু করা হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কেরাম বোর্ডের আসরে পরিণত হওয়া ছাড়া ক্লাব থেকে আর কিছুই পাওয়া যায়না।
আমরা শুরুতে মার্ক্সবাদী সমাজ তন্ত্রের ব‍্যর্থতা আলোচনা করেছিলাম। এটা মার্ক্সবাদের ব‍্যর্থতা না মার্ক্সবাদীদের ব‍্যর্থতা সে বিশ্লেষণ উনারাই করুন। ইসলামী সমাজতন্ত্রের ব‍্যর্থতার ব‍্যাপারে একশোভাগ মুসলিমরাই দায়ী, কুরআন সুন্নাতের শিক্ষা তা ই সাব‍্যস্ত করে। ক্লাবের ছেলেরা যেমন কেরাম বোর্ড নিয়ে ব‍্যস্ত, আমরা ব‍্যস্ত নফল, মুস্তাহাব, মুবাহ সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে।
মুসলিম সমাজকে ইসলামের নমুনায় গড়ে তোলার বহুমুখী তৎপরতা সর্বত্র চলছে। সমস্ত কর্মকাণ্ডের প‍রেও ইসলামের বা উম্মতের একটু আধটু সেবা ছাড়া আমূল পরিবর্তনের চিত্র ও সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। বরং দল সংগঠনের প্রতিষ্ঠা মুখ‍্য হয়ে উঠছে। কিছু সমচিন্তার লোকদেরকে নিয়েই এক একটি দল সংগঠন গড়ে উঠে। আমাদের সবারই অভিজ্ঞতা আছে এই সমস্ত সংগঠন উম্মতের ঐক‍্য সাধনে কতোটা সহায়ক। সকলের সাধারণ এজেণ্ডা যদি মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ ব‍্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়, তাহলে শুধু ঐক‍্য নয়, উপরে আলোচিত কল‍্যাণ ঝরতে শুরু করবে। কারণ একটি মসজিদ কেন্দ্রিক মহল্লায় একশো ভাগ লোকই ইমামের নেতৃত্ব মানে। আর সেই ইমাম যদি নামাজ পড়ানোর কর্মচারী না হয়ে সমাজকে প্রকৃত নেতৃত্ব দানকারী যোগ‍্যতা সম্পন্ন হন, তাহলে তার যুগান্তকারী প্রভাব দেখতে বেশীদিন সময় লাগবেনা।
ইসলামী সমাজতন্ত্র অবশ্যই নামাজ দিয়ে শুরু হয়। শুধু নামাজ পড়া নয়, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ, তওবা, আত্মসমীক্ষার মাধ‍্যমে। ব‍্যক্তি ও সমষ্টিগত সংশোধন ছাড়া ইসলামী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ সংশোধনের উদ্দেশ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নয়। এ সংশোধনের মূল লক্ষ‍্য ইসলামের সঠিক অনুসরণের মাধ‍্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আখেরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি, জান্নাতী জীবনের আকাঙ্খা। আল্লাহর ভয়, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা ও জাহান্নামের ভয় ছাড়া সংশোধনের আর কোন প্রেরণা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনা। বরং মানুষের চারিত্রিক সংশোধন অন‍্যান‍্য মতাদর্শের কোন এজেণ্ডার মধ্যেই পড়েনা। সেখানে মদুড়ী, ব‍্যভিচারী ইত‍্যাদি হয়েও বিপ্লবের নেতা হওয়া যায়। আর ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলে ঈমানদার এক মুহুর্তের তওবায় নিজেকে নতুন মানুষরূপে সাজাতে পারে। যারা একটি সফল সমাজতন্ত্র চান এবং এ ব‍্যাপারে চিন্তা ও শ্র্ম দিতে প্রস্তুত তারা যেন নিজের যোগ‍্যতাকে ভুলপথে ব‍্যয় না করেন। কুরআনের বাণী – “যারা ঈমানদার তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, যারা অবিশ্বসী তারা ইসলামবিরোধী মতাদর্শের পথে সংগ্রাম করে।”
লেখক: জামাআতে ইসলামী হিন্দ দক্ষিণ অসম জোনের সভাপতি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here