তাজমহলে একদিন – নূরুল হুদা হাবীব

0
তাজমহলের সামনে লেখক নূরুল হুদা হাবীব
নূরুল হুদা হাবীব : দেশভ্রমণ আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখি পাখির মত ডানা মেলে বিমানে এদেশ থেকে ওদেশে ঘুরে বেড়াবো। অবশেষে সে সুযোগ তৈরি হল। নয়াদিল্লিতে নিজের একটি জরুরি ব্যক্তিগত কাজের সুবাদে প্রতিবেশী দেশ ভারত ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে গেলাম। তবে আর দেরি কেন। একটি ট্রাভেল এজেন্সির ম্যানেজার প্রিয় বন্ধু জুয়েল এর মাধ্যমে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি টিকিট কেটে ফেললাম ঢাকা টু কলকাতা, কলকাতা টু নয়াদিল্লী।
২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে ফ্লাইট। ইমিগ্রেশন সহ এয়ারপোর্ট এর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যথাসময়ে বিমানে চেপে বসলাম। পঞ্চাশ মিনিট পরই কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলাম। অত্যন্ত নান্দনিক এবং বিশাল একটি এয়ারপোর্ট এটি। দীর্ঘ সাত ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ট্রানজিট শেষে পরদিন সকাল সাতটায় দিল্লির উদ্দেশ্যে ফ্লাইট।
ভাবলাম সারারাত এয়ারপোর্টে বসে কাটিয়ে দিব। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হলো। ওরাও কয়েকজন বন্ধু মিলে মানালি ঘুরতে যাচ্ছে। সারারাত চুটিয়ে গল্প করলাম। পরদিন যথাসময়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে বিমানে গিয়ে বসলাম। নয়াদিল্লি ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে একটি ট্যাক্সি নিয়ে পাশে মহিপালপুর বাজার থেকে সিম কিনে নয়াদিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে (সার্ক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যয়নরত আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক এক বড় ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে ব্যক্তিগত কাজটি সেরে ওনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরীতে চলে গেলাম।
দুই-তিন দিন কুতুব মিনার, দিল্লি শাহী মসজিদ, লালকেল্লা, ইন্ডিয়া গেট, নেহেরু পার্ক সহ দিল্লি নগরীর এথানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে কাটল। ইতোমধ্যে ফেনীর দুজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরীতে উঠলেন তাদের সাথে পরিচয় হলো। আলাপচারিতায় জানলাম উনারাও তাজমহল দেখতে যাবেন।উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত হায়দরাবাদের একজনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন ভাই দিল্লি টু আগ্রার ৪টি টিকিট ম্যানেজ করে দিলেন। রাইড সার্ভিস কোম্পানি উবারের মত OLA নামক একটি কোম্পানির রাইড সার্ভিস নিয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আমরা দিল্লির নিজামুদ্দিন রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
যথাসময়ে ট্রেন আগ্রার উদ্দেশ্যে ছেড়ে চলল। যে তাজমহলকে এতদিন ছবিতে বা ইউটিউবে দেখতাম সেটিকে স্বচক্ষে দেখতে যাচ্ছি, এটি ভেবে ভেতরে এক ধরনের অবর্ণনীয় পুলক কাজ করছিল।
ট্রেন যত এগুচ্ছে শীতের মাত্রা তত বাড়ছে । আমি প্রচন্ড শীতে কাঁপতে লাগলাম। আমাদের চারজনের সিট পড়েছে ৩ বগিতে। আমার বগিতে আমি একা। ইন্ডিয়ান ট্রেনের সিটগুলো আমাদের দেশের সিটের মতো পাশাপাশি নয়, লম্বালম্বি। এটাকে ঠিক সিট বলা যায় না বরং এক একটি বেড। কেননা ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যের দূরত্ব বেশি হওয়ার কারণে সকলকেই ট্রেনে শুয়ে যেতে হয়।
শীতে যত না বেশি কষ্ট হচ্ছিল তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল পাশের বেডে এক মহিলার উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ার কারণে। ট্রেনে উঠার পর থেকে পর থেকে হিন্দী গানের সুরে একটানা মন্ত্র পড়েই চলেছেন। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা উনি একনাগাড়ে মন্ত্র জপেছেন। কিছু বলতেও পারছিনা সইতেও পারছি না। তিন ঘন্টা পর আমরা আগ্রা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছলাম। পৌছেই পরদিন দিল্লি টু কলকাতা টিকিট কনফার্ম করে তারপর তাজমহলের উদ্দেশ্যে সিএনজি নিলাম। প্রায় আধা ঘন্টা পর আমরা নাস্তা শেষে তাজমহলের টিকিট ক্রয় করে ভেতরে ঢুকলাম। প্রতিজনের টিকিটের মূল্য 540 রুপি। এটি কেবল ইন্ডিয়ান এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য। তাজমহলের এরিয়া বেশ বড়। তাজমহল এলাকায় প্রবেশ করেই মনে হলো যেন স্বপ্নের ভেতরে এক অদেখা বাস্তবে প্রবেশ করলাম।
মূল তাজমহলে যাবার আগেই পুরো অঞ্চলটি চারদিক থেকে শক্ত লাল পাথরে নির্মিত দেয়ালঘেরা। আমি যতই এগুচ্ছি কৌতুহল তত বাড়ছে। আর তর সইছেনা, কখন দেখবো স্বপ্নের তাজমহল। কিছুদূর হাঁটতে হাঁটতে প্রকাণ্ড এক গেটের ভেতর দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল ধবধবে সাদা তাজমহল। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে সকলেই ছবি তুললাম যে যার মত। সারা পৃথিবী থেকে অসংখ্য পর্যটক এসেছেন আবালবৃদ্ধবনিতা। নানা ধর্মের নানা বর্ণের নানা জাতির পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ সেখানে দেখলাম। ছবি তুলতে-তুলতে আমরা এগিয়ে গেলাম একদম তাজমহলের কাছাকাছি। খুব কাছ থেকে তাজমহল কে দেখছি আর ভাবছি এটা সেই তাজমহল যে তাজমহলকে ছোটবেলা থেকে বইয়ের পাতায় ছবিতে দেখেছি, আজ সে স্বপ্নের একদম কাছাকাছি।
সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি প্রকাণ্ড বড় একটি মহল। চারদিকে চারটি মিনার। অত্যন্ত নান্দনিক কারুকার্যে স্থাপিত পৃথিবীর অন্যতম একটি পর্যটক আকর্ষণ এটি। তাজমহলের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম নয়ন ভরে। পুরো তাজমহল কমপ্লেক্সে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হওয়ার উপক্রম। তাজমহলের বামপাশে বসে পড়লাম। বসে বসে একদৃষ্টে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে দেখছি আর ভাবছি। অপলক দৃষ্টিতে তাজমহলের দিকে থাকিয়ে তাজমহলের রূপ সুধা নিচ্ছি যেন দেখা শেষই হচ্ছে না। তাজমহলের ঠিক পেছনেই নদী। নদীর পাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। নদীতে তেমন পানি নেই। পুনরায় এসে তাজমহলের পাশে বসে পরলাম। গল্পে গল্পে আমাদের একজন বলে উঠল মহলের গায়ের পাথর খুবই ঠাণ্ডা। আমি বললাম তাই! সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে দেয়ালে হাত দিয়ে দেখি মারাত্মক ঠান্ডা।
ওদিকে সূর্য প্রায় পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার উপক্রম আমাদের বিদায় নিতে হবে কিন্তু তাজমহলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদেরকে এমনভাবে বিমুগ্ধ করেছে যে সেখান থেকে সরতে ইচ্ছে করছে না। ফেরার সময় বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম যেন তাকে ছেড়ে আসতে মন চাইছে না। তাজমহল প্রাঙ্গণ থেকে বের হতে অবশেষে মনকে এ বলে প্রবোধ দিলাম- “শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের জন্য আর কত সুন্দরই বানিয়েছে, আমি আমার ভবিষ্যৎ মমতাজের জন্য এর চেয়ে সুন্দর করে তৈরি করবো। মনে মনে বলতে বলতে দিল্লীর পথে পা বাড়ালাম।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সাউথ এশিয়ান ইয়ূথ আ্যসোসিয়েশন (SAYA)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here