মরুভূমির সিংহ লিবিয়ার মুক্তি যুদ্ধা ওমর মোকতার- মুসলিম বিশ্ব যাকে স্মরণ করে ভালোবাসার সাথে

ইতালীয় ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে মুখতারের প্রায় ২০ বছরব্যাপী লড়াই ১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার প্রেপ্তারের মাধ্যমে সমাপ্তি লাভ করে। স্লোনটার নিকটে যুদ্ধে তিনি আহত অবস্থায় প্রেপ্তার হন। তাকে প্রেপ্তারে সাহায্য করায় স্থানীয় নেতাদেরকে পুরষ্কৃত করা হয়। তার দৃঢ়তা জেলারের উপর প্রভাব ফেলে।

0
হিফজুর রহমান খাজাম: পরাশক্তির হাতে যখন রাষ্ট্রশক্তি বিপর্যস্ত, সেই সময়ে  আধ্যাত্মিকতা দ্বারা পরিবেষ্টিত রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, জন্মগত যোদ্ধা, একটি সামরিক রাজনৈতিক দলের নিখুঁত নির্মাতা, যিনি ২০ বছর ধরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নায়কদের (ইতালিওদের) চারজন গভর্নরের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে আজকের এই আলোকপাত।
ওমর মোক্তার এর নাম হলো ওমর আল মুখতার মোহাম্মদ বিন ফরহাদ আল মানিফি। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসের ২০ তারিখে সারেনাইকে (পূর্ব লিবিয়ার) বুটওয়ান এ তার জন্ম হয়। মুসলিম বিশ্বে তিনি মরুর সিংহ বলে পরিচিত। গ্যারাবুবে (বর্তমান লিবিয়ায়) আট বৎসর তিনি শিক্ষা অর্জন করেন। জীবনের শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে তিনি তার শিক্ষকতা চালিয়ে যেতে পারেননি। শিক্ষকতা তাকে অন্যায়ের প্রতিবাদী করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি এবং তার মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯২৩ ইংরেজিতে ইতালিয়রা যখন খোলাখুলিভাবে লিবিয়দের উপরে আক্রমন করে তখন তিনি একটি শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেন। তার কুটচালি যুদ্ধ কৌশলে চিন্তিত হয়ে তার মোকাবেলায় গভর্নর মামবেলি জিবেল আকদারের পাহাড়ি অঞ্চলে ১৯২৪ ইংরেজিতে একটি পাল্টা গেরিলা বাহিনী গড়েন। ওমর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ কৌশল পাল্টে দেন এবং মিশরের সাহায্যে তার প্রতিরোধ চালিয়ে যান।
ছবি: Google Image
১৯২৭ ইংরেজিতে ওমরের গিয়ারাবুর দখল সত্ত্বেও স্বৈরাচারী গভর্নর তেরুজির শক্তি বৃদ্ধিতে এবং রুহিবায় ইতালি ও সামরিক শক্তির উপস্থিতিতে আশ্চর্যান্বিত হন। জিবেল পাহাড়ি ও বিভিন্ন অঞ্চল  আক্রমণে তিনি অপসারিত হতে বাধ্য হন। ইতালির প্রতিনিয়ত আক্রমণের মধ্যে ও ১৯২৭-১৯২৮ সালের মধ্যে তিনি আবার তার বাহিনী জড়ো করে তার প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে সচেষ্ট হন। এমনকি ওমরের ব্যতিক্রমী অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, অধ্যবসায় কে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন ইতালি ও জেনারেল তেরোজি।
লিবিয়ার নতুন গভর্নর পিয়েত্র বেডুগুলিও ১৯২৯ ইংরেজির জানুয়ারীতে এক চতুর চাল চালেন। গভর্নর বেডগুলিও ও ওমরের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর আগের ইতালি ও স্থানীয় চুক্তির অনুকরণে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হন। সৈন্য বাহিনীর মধ্যে এমন এক প্রচার চলতে থাকে যে অমর মুখতার আত্মসমর্পণ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণাটি ইতালি ও নেতারাও সমর্থন করতে থাকেন। এক সময় গভর্নর (Badoglio) এই প্রচার কে সমর্থন করে বসলেন যাতে ওমর মোক্তার উত্তেজিত হয়ে উঠেন।
১৯২৯ ইংরেজির  অক্টোবর মাসে ওমর মোক্তার চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন। লিবিয়া প্রতিরোধ বাহিনীর মধ্যে উদ্দেশ্য এবং কর্মের মধ্যে ঐক্য আনার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করেন। এবং নিজেকে ইতালির বিপক্ষে চূড়ান্ত মোকাবেলার জন্য তৈরি প্রস্তুতি শুরু করেন।
ওমর মুক্তারের আক্রমণাত্মক আক্রমণের বিপক্ষে   জেনারেল গ্রাজিয়ানি, পিএতরা বাদগলিও, ঔপনিবেশিক মন্ত্রী ডিবানো এবং বেনিতো মুসোলিনি মুক্তার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার কঠোর পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল প্রথম হল জিবেল অঞ্চল থেকে এক লক্ষ লোককে সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে যুদ্ধ বন্দী করে রাখা যাতে করে তারা মোক্তার এর সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখতে পারে না। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হল মিসরের সঙ্গে যুক্ত উপকূল থেকে শুরু করে সকল বর্ডার বন্ধ করে দেওয়া। এই পদক্ষেপে জনসাধারণের সঙ্গে এবং সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া।
ওমর মোক্তার বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি কে রহিত করে, গুপ্তচরের জালে আটকে বাইরের সাহায্য বন্ধ করে ইতালি ও বিমান বাহিনীর আক্রমণে এবং স্থানীয় চরের সাহায্যে ইতালীয় পদাতিক বাহিনীর আক্রমণে জেনারেল গ্ৰজিয়ানিব ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তার মরন কামড় দেন।
কঠিন পরিস্থিতি ও বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে ওমর মোক্তার যুদ্ধ চালিয়ে যান কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে জনতা নামক স্থানে (Zonta) ইতালি ওদের অতর্কিত আক্রমণে তাঁর হার মানতে হয়। তিনি বন্দী হন এবং ওমর মুখতারের ফাঁসি মাত্র তিন দিনের মধ্যেই মুখতারের বিচার সম্পন্ন হয়। বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর রায়ে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়া হয়। তবে ঐতিহাসিকদের মতে এই বিচার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছিল না। শেষ কথা জানতে চাওয়া হলে মুখতার কুরআনের আয়াত “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন” (আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছেই ফিরে যাব) পাঠ করেন। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সুলুকের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তার অনুসারীদের সামনে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। হে বীর যোদ্ধা তোমায় সালাম।
ওমর মুখতারের নির্দয় শত্রু বা নিষ্ঠুর প্ৰঅতিপক্ক জেনারেল গ্রাজিয়ানি মোকতারের দৈহিক গঠন এবং চরিত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন উচ্চতায় মুক্তার মধ্যম হলেও সবল, শক্তদেহি, কঠোর পরিশ্রমী, নিখুঁত সাদা দাড়ি গোপ বিশিষ্ট ব্যক্তি, জন্মগতভাবে   তাৎক্ষণিক বুদ্ধিসম্পন্ন, জীবন্ত মেধাবী, ধর্ম জ্ঞানী, প্রেরণাদায়ক চরিত্র বিশিষ্ট নিঃস্বার্থ এবং কর্ম ও বিশ্বাসে আপোষহীন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনি ধার্মিক এবং গরিব ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here