বিষয়- নোবেলজয়ী এস্থার ডুফলো

0
ছবি: সংগৃহীত

সকলেই অবগত যে ২০১৯-এর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী হয়েছেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দোপাধ্যায়, এস্থার ডুফলো, এবং মাইকেল ক্রেমার। তাঁদের এই স্বীকৃতি নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ভারতবর্ষের মানুষ এবং বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে, কারণ নোবেলজয়ীদের মধ্যে একজন বাঙালি। তাঁদের নিয়ে ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমে বহু আলোচনা তর্ক হয়ে গেছে, যা হয়ত আপনাদেরও অবগত। বিশেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত বন্ধুবর অমিতাভ গুপ্ত এবং স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ মৈত্রেশ ঘটকের রচনাটি বিশেষ দ্রষ্টব্য (যাঁরা এখোনো তা পড়েননি এবং এই বিষয় সম্পর্কে আগ্রহী তাঁদের অনুরোধ করবো ওই লেখাটি আগে পড়তে)। গত কয়েক দিন অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় একাধিক সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন সংবাদমাধ্যমে, যার মধ্যে বন্ধুবর রোশান কিশোরের সাথে হিন্দুস্থান টাইমসের সাক্ষাৎকারটিও সকলকে দেখার অনুরোধ থাকবে (ইউটিউব)। এর পরেও এই নিয়ে লেখার বিশেষ কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু কিছু মানুষ আমাকে ইনবক্সে বলেছেন এই নিয়ে লিখতে এবং এস্থার ডুফলোর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে এই লেখা। তবে লেখা শুরুর আগেই বলে দেওয়া প্রয়োজন যে আমি নিজেকে একজন অর্থনীতির ছাত্রের বেশি কিছু মনে করি না, এবং অন্য কেউও তার চেয়ে বেশি কিছু মনে করে বলে জানি না, তাই ভুল ত্রূটি নিজগুনে ক্ষমা করবেন। এবার ভূমিকা বাদ দিয়ে মূল বিষয়ে আসা যাক।

প্রথমেই বোঝা দরকার যে ওনারা কেন স্বীকৃত হলেন। নোবেল কমিটি বলেছে যে ওনাদের পুরস্কার দেওয়ার কারণ হলো ওঁরা “দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য, অশিক্ষা ইত্যাদি সমস্যা দূরীকরণে কোন প্রকল্প সব থেকে বেশি কার্যকরী হতে পারে তা পরীক্ষা নিরীক্ষার (এক্সপেরিমেন্ট) মাধ্যমে নির্ধারণ করার উপায় বের করেছেন।” এই সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করার লোক অর্থনীতিবিদ্যায় নেহাৎ কম নেই। উল্টে বলা যেতে পারে যে অর্থনীতির অধিকাংশ গবেষণাই মানুষের মধ্যে বৈষম্যের কার্যকারণ এবং তাকে দূরীকরণের উপায় নিয়েই। ডানপন্থী কি বামপন্থী- দু মতাদর্শের অর্থনীতিবিদরাই এই নিয়ে তাঁদের মতন করে ভাবেন। তাহলে এঁদের কাজ অন্য অর্থনীতিবিদদের থেকে কী ভাবে আলাদা যার জন্য নোবেল পেলেন? অভিজিৎ, এস্থারদের অর্থনীতিবিদ্যায় সব থেকে বড় অবদান হলো রান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়ালের (RCT) ব্যবহার। RCT আসলে এক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট। সেটা কী বুঝতে গেলে আগে বুঝতে হবে ওর প্রয়োজন কেন পড়ে।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে যেমন কোনো রকম এক্সপেরিমেন্ট করার সময় আইসোলেটেড সিস্টেম তৈরি করা হয় সেরকম এক্সপেরিমেন্ট অর্থনীতিবিদ্যায় করা মুশকিল। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্টে যা করা হয়ে থাকে তা হলো যাকে পর্যবেক্ষণ করছি, কোনো ক্রিয়ার ফলে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করি, তারপর সেই প্রতিক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করে যাকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম তার সম্পর্কে কিছু তত্বে পৌঁছই। কিন্তু এই সমস্ত এক্সপেরিমেন্টেই যেটা উহ্য থাকে সেটা হলো যে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিয়ার কারণেই যে ওই প্রতিক্রিয়া ঘটলো, অন্য কারণে নয় সেটা সম্পর্কে নিশ্চিত হই একটা আইসোলেটেড সিস্টেম বানিয়ে যেখানে বাইরের অন্য কোনো কিছুর প্রভাব পড়বে না। একটা কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক আপনি হয়ত দেখতে চান যে দুটো বিশেষ কণার সংঘর্ষের ফলে কী কী ঘটে। এবার একটা সাধারণ পাত্র বানিয়ে সেখানে দুটো কণার মধ্যে সংঘর্ষ ঘটালেন এবং যা যা লক্ষ্য করলেন তা কোনো পত্রিকায় ছাপিয়ে দিলেন। কয়েকদিন পর অন্য এক বিজ্ঞানী আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন যে ওই একই রকম একটা পাত্রতে দুটো কণাকে শুধু চুপচাপ বসিয়ে রাখলেও আপনি যা যা লক্ষ্য করেছেন সেই সবই লক্ষ্য করা যায়, সংঘর্ষ করাতে হয় না। চ্যালেঞ্জ পেয়ে আপনি নিজে ফের ওই পরীক্ষা করলেন কিন্তু এবার সংঘর্ষ ছাড়াই এবং দেখলেন যে সত্যি তো ওই বিজ্ঞানী ঠিকই বলেছেন। আপনি তখন অপদস্থ। তারপর আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝলেন যে আসলে আপনার এক্সপেরিমেন্ট ভুল কারণ আপনি ঠিক মত আইসোলেটেড সিস্টেম বানাতে পারেননি। মহাকাশ থেকে অর্বুদ নির্বুদ কণা সবসময়তেই পৃথিবীর বুকে ধেয়ে আসছে এবং একটা সাধারণ পাত্র বানালে সেই সব কণা পাত্র ভেদ করে অনায়াসে ঢুকে পড়ছে আর আপনার যে দুটো বিশেষ ধরণের কণা নিয়ে আগ্রহ তাদের সাথে ক্রমাগত ধাক্কা খাচ্ছে। তাই ওই দু ধরণের কণার সংঘর্ষের ফলে যে ফলাফল পাচ্ছিলেন বলে আপনি আগে ভাবছিলেন তা আসলে ভেজাল। তাই এরপর আপনি যেটা করলেন তা হলো একটা এমন পাত্র বানালেন যাতে বাইরে থেকে কোনো কিছু প্রবেশ করতে পারবে না, কোনো কণাও না- আইসোলেটেড সিস্টেম। তারপর প্রথমে দুটো কণাকে শুধু সেখানে বসিয়ে রেখে আপনি সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে পাত্রের ভেতরকার পরিস্থিতি মেপে দেখলেন, এবং সংঘর্ষ ঘটিয়ে ফের সেই সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে পাত্রের ভেতরকার পরিস্থিতি মেপে দেখলেন। ওই দুই পরিস্থিতির তফাৎই হলো আপনার কণাদের সংঘর্ষের ফলাফল। আইসোলেটেড সিস্টেম একই সাথে দুটো কার্য সাধন করে। এক, সে আপনার পর্যবেক্ষিত কণাগুলোকে বিশ্বের বাকি সমস্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে। দুই, যে কণাদের ওপর আপনি ক্রিয়া করলেন তাদেরকে একই জাতের অন্য কণাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, যার ফলে দুই কণার ক্রিয়া-পরবর্তী তফাৎ থেকে আপনি বলতে পারবেন যে এই তফাৎটি আসলে আপনার ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া। এই যেসব কণার ওপর ক্রিয়া করলেন তাদেরকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “ট্রিটেড” আর যাদের ওপর কোনো ক্রিয়া করলেন না, শুধু পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করলেন তাকে বলে “কন্ট্রোল”। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক্সপেরিমেন্টের আরো সহজ উদাহরণ মিলবে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদ্যা সমাজবিজ্ঞান, কোনো মানুষকে একটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্রের সামনে আইসোলেটেড সিস্টেমে বন্দি করে তার ওপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো একদিকে যেমন অমানবিক, অপর দিকে তা ফালতুও। তার কারণ একটি জড়ভরত কণার মত মানুষ কার্যকারণের দাস নয়, একই ক্রিয়ার একেক জন মানুষের একেক রকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কোনো কোনো মানুষের সামনে ক্রমাগত “ভারত মাতা কি জয়” বলে চেঁচালে তার যেমন খুব আনন্দ হবে তেমনই কিছু মানুষের মধ্যে বিরক্তি বা ত্রাসের সৃষ্টি হবে। তাই মানুষের ক্ষেত্রে ওরকম এক্সপেরিমেন্ট করে কিছু জানা মুশকিল। সমাজবিজ্ঞানী এবং কলনশাস্ত্রীরা বিগত ৫০ বছর ধরে ক্রমাগত চেষ্টা করে গেছেন এই সমস্যা সমাধানে। যে হেতু মানুষ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার অনেক সমস্যা থাকে তাই তার পরিবর্তে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন তারা। এইরম অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটতে পারে আবার সরকারি নীতির বদলের জন্যেও ঘটতে পারে, এইরম অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় “ইভেন্ট” বলা হয়। যদি এমন ঘটনায় একটা বড় সংখ্যক মানুষ প্রভাবিত হোন এবং ঘটনাটি ঘটার আগে ও পড়ে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের থেকে তথ্য জোগাড় করতে পারেন তাহলে আপনি একজন গড়পড়তা মানুষের চিন্তা ভাবনা আর আচার ব্যবহার সম্পর্কে কিছু মৌলিক তত্ব পেতে পারেন। আপনি আসলে ওই কণা নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের ক্রিয়াকে এইখানে অপ্ৰত্যাশিত ঘটনা বা ইভেন্ট দিয়ে রিপ্লেস করছেন। এই ক্ষেত্রেও আপনাকে দু রকম মানুষের থেকে তথ্য জোগাড় করতে হবে ইভেন্টটির প্রভাব বুঝতে গেলে- যে সব মানুষ সেই ইভেন্টে প্রভাবিত অর্থাৎ সেই “ট্রিটেড” এবং যাদের এই ইভেন্টে প্রভাবিত হওয়া সম্ভাবনা নেই, অর্থাৎ “কন্ট্রোল”। ইভেন্টের পর এই দুই দলের মানুষের মধ্যে আচার ব্যবহারে কোনো তফাৎ পাওয়া গেলে তাহলে বলা যেতে পারে যে সেটা ওই ইভেন্টেরই প্রতিক্রিয়া। তবে সেটা শর্তসাপেক্ষ।

এই ভাবে এক্সপেরিমেন্টকে কায়দা করে পাশ কাটিয়ে, মানুষের আচার ব্যবহার সম্পর্কে মৌলিক সিদ্ধান্তে আসতে গেলে কিছু পূর্বশর্ত মানা প্রয়োজন। প্রথমত, যেহেতু এই ক্ষেত্রে কোনো আইসোলেটেড সিস্টেম তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে না তাই বিশ্বে দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া আরো হাজারটা ঘটনা সমস্ত মানুষের ওপরে প্রভাব ফেলছে। তাই ইভেন্টের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছু অনুমান করতে গেলে ওই ইভেন্টের আগেকার অবস্থা সম্পর্কেও তথ্য প্রয়োজন। অর্থাৎ এই ট্রিটেড এবং কন্ট্রোল- দু’দলের লোকের থেকেই ইভেন্টের পূর্ববর্তী সময়কারও তথ্য নিতে হবে। তারপরই ইভেন্টের আগে ও পরে, দু দলের আচার ব্যবহারে তফাৎ থেকে হিসেব করা যাবে যে আসলে ইভেন্টের প্রতিক্রিয়া ঠিক কতটুকু। এতে আইসোলেটেড সিস্টেম না বানাতে পারার খামতি সম্পূর্ণ ভাবে দূরীভূত না হলেও অন্তত কিছুটা কমানো যায়। দ্বিতীয় শর্ত হলো, যেহেতু মানুষে মানুষে অনেক তফাৎ তাই আপনি তথ্য বিশ্লেষণ করে যা পেলেন তা সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রেই মোটের ওপর প্রযোজ্য- এটা দাবি করতে গেলে ওই ট্রিটেড ও কন্ট্রোল দলের মানুষের একই ধরণের হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, যদি এমন হয় যে ইভেন্টটি একটি বিশেষ ধরণের মানুষকেই প্রভাবিত করলো তাহলে আপনার ট্রিটেড আর কন্ট্রোল দলদুটো চরিত্রগত ভাবে আলাদা হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে ইভেন্ট পরবর্তী কোনো পার্থক্য থেকে কিছু সিদ্ধান্তে আশা মুশকিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় পূর্বশর্তটিতে অটল থাকা মুশকিল হয়। পুরোটা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক।

ভারতে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা যোজনার কথা অনেকেই শুনেছেন। এই প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্র সরকার নামমাত্র টাকায় দরিদ্র পরিবারগুলিকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কভারেজের স্বাস্থ্য বীমা করে দিয়েছে। দেশের কয়েক কোটি পরিবার এই স্বাস্থ্য বিমার আওতায় এসেছে। এবার ধরা যাক কোনো সরকারি আধিকারিক মনে করলেন যে বিমা প্রকল্পে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে কিন্তু আদৌ গরিব মানুষের কোনো লাভ হচ্ছে কি না হিসেব করে দেখা উচিত। এই ক্ষেত্রে উনি কী করতে পারেন? গ্রামে গঞ্জে ঘুরে কয়েক হাজার মানুষের থেকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য নিতে পারেন, যেমন বীমা করিয়েছে কি না, যারা করিয়েছে তারা বীমা করার আগে বছরে কতবার ডাক্তারের কাছে যেত বীমা করার পর কতবার যায়, যাদের বীমা নেই তারাই বা কতবার যায় ইত্যাদি। এইবার সব তথ্য জোগাড় করে তিনি হিসেব করতে বসলেন। দেখা গেল যে যারা বীমা করিয়েছেন তারা স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্পের আগে যতবার ডাক্তারের কাছে যেত তার থেকে এখন বেশি যাচ্ছে কারণ ডাক্তারের খরচ বীমা সামলে দিচ্ছে। এই তথ্য দেখে হয়ত আধিকারিক বাবু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে বীমা প্রকল্প সফল, মানুষ স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি যত্ন নিচ্ছে।কিন্তু সেটা হবে ভুল সিদ্ধান্ত। কেন? কারণ হয়ত দেখা গেল যে এই পাঁচ বছরে গোটা দেশের সব মানুষই স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে, সকলেই বেশি করে ডাক্তার দেখাচ্ছে, বীমা থাকুক কি না থাকুক। তাই বীমার কার্যকারিতা হিসেব করতে হলে উচিত হবে সেই সব লোকেদের সাথে তুলনা করা যাদের বীমা নেই, যাদের বীমা নেই তাদের মধ্যে ডাক্তারের কাছে যাওয়া কতটা বেড়েছে আর যাদের বীমা আছে তাদের মধ্যে কতটা- এই তুলনা থেকে কিছু সিদ্ধান্তে আসা যাবে। আধিকারিক বাবু এবার তাই করলেন, কিন্তু এবার হিসেব করে দেখা গেল যে যাদের বীমা নেই তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেশি বেড়েছে বিমাকারীদের তুলনায়, তারা বিমাকারীদের তুলনায় আরো বেশি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন। এবার আধিকারিক বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন যে সরকারের এত টাকা খরচ করল বীমা প্রকল্পে কিন্তু কোনো লাভই হলো না, যাদের বীমা নেই তারা বরং বেশি সচেতন হচ্ছে বিমাকারীদের তুলনায়। কিন্তু এটিও ভুল সিদ্ধান্ত হবে। কেন? কারণ ওপরেই লিখেছি যে এই বীমা যোজনা শুধুই গরিব মানুষের জন্য, এর আওতায় যাঁরা রয়েছেন তাঁরা সব গরিব মানুষ। তাহলে যেটা দাঁড়ায় যে যাদের বীমা নেই তারা অপেক্ষাকৃত ধনী। এবার যদি দেখা যায় যে গত পাঁচ বছরে ধনীদের রোজগার অনেক বেশি বেড়েছে গরিব লোকের তুলনায় তাহলে এমন হতেই পারে যে ধণীদের মধ্যে স্বাস্থ্য নিয়ে খরচ করার সাধ্য গরিব মানুষের তুলনায় বেশি বেড়েছে, ফলে তাদের হাসপাতাল-ডাক্তারে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি বেড়েছে। তাহলে এবার আধিকারিক বাবু কী করবেন? উনি বিচক্ষণ মানুষ, বুঝলেন যে তুলনা যদি করতে হয় তাহলে এমন লোকের মধ্যে করতে হবে যারা এক রকম অর্থাৎ বিমাকারীরা যদি গরিব হয় তাহলে তাদের তুলনা করতে হবে সেই সব গরিব লোকের সাথে যারা কোনো কারণে বীমা করেননি। ফের খাতাকলম নিয়ে বসলেন তিনি এবং এবার হিসেবে পেলেন যে বিমাকারীদের মধ্যে ডাক্তার দেখানোর প্রবণতা বীমা বহির্ভূত গরিব মানুষের চেয়ে বেশিই। আধিকারিক বাবু এবার নিশ্চিন্ত। আমরাও নিশ্চিন্ত যে পূর্বশর্তগুলো মোটামুটি সন্তুষ্ট করা গেছে। কী তাই তো? তবুও একটা খুঁতখুঁতুনি থেকে যাচ্ছে। কেন বলুন তো? কারণ এই বীমা করানোর জন্য সরকার আপনাকে জোর করবে না, আপনি নিজের তাগিদে পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে পরিবারপিছু ৩০ টাকা দিয়ে নিজের পরিবারকে নথিভুক্ত করাবেন। তিরিশ টাকা খুবই সামান্য, সেই নিয়ে সমস্যা নেই কিন্তু এই যে নিজের থেকে গিয়ে নাম নথিভুক্ত করানো এটা করার তাগিদ কার মধ্যে বেশি হবে? দু ধরণের মানুষের মধ্যে- এক, যাঁরা তুলনামূলক ভাবে স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশি সচেতন এবং দুই, যাঁদের পরিবারে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি আছেন যাঁর জন্য চিকিৎসার খরচ হয় নিয়মিত। এবার এই দু ধরণের মানুষের মধ্যেই কিন্তু হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রবণতা অপেক্ষাকৃত বেশি হবে যাঁরা গরিব হয়েও নথিভুক্ত করায়নি তাদের থেকে। অর্থাৎ কন্ট্রোল ও ট্রিটেড দুটো দলের কিছু মৌলিক পার্থক্য কিন্তু রয়েই গেলো আর তাই ইভেন্ট পরবর্তীতে তাদের মধ্যে আচার ব্যবহারের তফাৎ থেকে কিছু সিদ্ধান্তে আসা কিন্তু মুশকিল।

ওপরের উদাহরণটিতে এটাই দেখানোর চেষ্টা করলাম যে এক্সপেরিমেন্ট যখন ইচ্ছে মত ডিজাইন করা সম্ভব হয় না, যখন ইভেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয় তখন এরকম ধরণের নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এইখানেই RCT-র প্রবেশ। RCT ইভেন্টের সমস্যাগুলিকে অতিক্রম করে, ইভেন্টের ওপর নির্ভর না করে বরং এক্সপেরিমেন্টকে নিজেদের সুবিধামতো ডিজাইন করে। হ্যাঁ, RCT হলো এক্সপেরিমেন্ট। যখনই এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ থাকে তখনই কিন্তু আর ওই কন্ট্রোল এবং ট্রিটেডের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের সমস্যাটা থাকে না। আপনি বেছে নিলেন এমনই একটা জনগোষ্ঠী যাঁরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে একরকম, এবার আপনার “ইচ্ছে মতো” গোষ্ঠীকে দু ভাগে ভাগ করলেন, এক দলকে ট্রিটেড করলেন আর অপরটিকে কন্ট্রোল। এইখানে ইচ্ছে মতো শব্দ দুটিকে কোটেশনে রাখার পেছনে কারণ আছে, এখানে “ইচ্ছে মতো”-র মানে এক বিশেষ ভাবে ভাগ করা, যে সুযোগ ইভেন্টের ক্ষেত্রে থাকে না কারণ সে ক্ষেত্রে কে ইভেন্টে প্রভাবিত আর কে নয় – তা আপনি ঠিক করতে পারবেন না। এই বিশেষ ভাবে ভাগ করাটা কী রকম? এই যে আর্থসামাজিক দিক দিয়ে সমজাতীয়- এমন একটা গোষ্ঠীকে আপনি বেছে নিলেন এইখানেও কিন্তু প্রতিটি মানুষ একে অপরের থেকে ভিন্ন হবে। হয়ত অর্থনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির দিক দিয়ে তাঁরা একই রকম কিন্তু তবুও তো প্রতিটি মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা হয়। তাই যেমন খুশি তেমন ভাবে ভাগ করলে হয় না বরং চোখ বন্ধ করে দুটো দলের মধ্যে গোষ্ঠীটিকে ভাগ করতে হবে। চোখ বন্ধ করে। ধরা যাক একটা গোষ্ঠীতে ১০০ জন মানুষ আছেন। এই ১০০ জন মানুষ একই আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে এলেও এদের মধ্যে অনেক রকম তফাৎ থেকে যায়, কয়েকজনের স্বাস্থ্য ভালো কয়েকজনের খারাপ, কয়েকজন রাগী আবার কয়েকজন ঠান্ডা প্রকৃতির, কয়েকজন বোকা কয়েকজন চালাক। এবার কলনশাস্ত্র বলে যে এই প্রতিটি দোষ বা গুণই একটা গোষ্ঠীর মধ্যে এক বিশেষ ভাবে বন্টিত। আপনি যদি চোখ বন্ধ করে বা লটারির মাধ্যমে এদের মধ্যে থেকে ১০ জনকে বেছে নেন তাহলে সেই দশজনের মধ্যেও এই দোষ গুণগুলি একই অনুপেতে বন্টিত থাকবে। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে যদি ৫০ জনের স্বাস্থ্য ভালো হয় আর ৫০ জন রুগ্ন হয় তাহলে চোখ বন্ধ করে ১০ জনকে বেছে নিলে ৫ জন স্বাস্থ্যবান এবং ৫ জন রুগ্ন পাবেন। হয়তো একবারে পাবেন না কিন্তু বেশ কয়েকবার চোখ বন্ধ করে বাছলে বন্টনটা ওরকমই দাঁড়াবে। গোটা কলনশাস্ত্র দাঁড়িয়ে আছে এই তত্বের ওপর। তাই RCT-র প্রথম ধাপ হলো চোখ বন্ধ করে কিছু মানুষকে গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া। একেই বলে রান্ডম সিলেকশন, RCT-র ‘R’ এসেছে এই রান্ডম থেকে। এর ফলে আপনার ট্রিটেড এবং কন্ট্রোল দুটো দলের ভেতর মোটের ওপর কোনো তফাৎ থাকা উচিত নয়, তারা আর্থসামাজিক দিক দিয়ে এক এবং রান্ডম সিলেকশনের ফলে বাকি সব দিক দিয়েও মোটের ওপর এক। এরপর দুটো দলের ক্ষেত্রেই আপনি এক্সপ্রেমীমেন্ট করার আগেই বিভিন্ন রকম তথ্য সংগ্রহ করে রাখলেন।

এর পর ট্রিটেডের ওপর কোনো একটা ক্রিয়া করলেন, হয়তো তাদের পুষ্টির ওষুধ দিলেন, অথবা কিছু টাকা দিলেন, বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানীয় জলের ব্যবস্থা দিলেন, বিভিন্ন রকমের ক্রিয়া, যাকে এই ক্ষেত্রে বলা হয় “ট্রিটমেন্ট”, তা দিলেন। এরপর কয়েক মাস বা বছর খানেক বাদে ফের এই দুটো দলের থেকে আগে যে বিষয়গুলোর ওপর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন ফের তা করলেন। তারপর দেখলেন যে দুটো দলের মধ্যে কোনো তফাৎ দেখা যাচ্ছে কী না। যদি যায় তাহলে আপনি দাবি করতে পারবেন যে এই তফাৎ আসলে আপনার ক্রিয়া অর্থাৎ ট্রিটমেন্টের ফল। লক্ষ্য করে দেখার যে যেহেতু ট্রিটেড ও কন্ট্রোল- দুটো দল এই ক্ষেত্রে প্রায় সব দিক দিয়ে এক রকম তাই ইভেন্টের ক্ষেত্রে দুটো দলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের যে সমস্যাটা মাঝেমধ্যে ঘটে (রাষ্ট্রীয় বীমা যোজনার উদাহরণটা যা নিয়ে) তা এখানে নেই। এই কারণেই RCT জনপ্রিয়তা পেয়েছে। RCT-র অনেক সিদ্ধান্তই অর্থনীতিবিদ্যায় আমূল পরিবর্তন এনেছে, অনেক প্রচলিত ধারণাই ভেঙে দিয়েছে। যেমন শিশুদের কৃমির ওষুধ খাওয়ালে বা তাদের পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দিলে তাদের লেখাপড়ায় যত প্রভাব পড়ে ততটা স্কুলে বাড়তি টিচার দিয়েও পড়ে না। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, কিন্তু তা বিষয়টাকে বুঝতে সাহায্য করবে না তাই উদাহরণ থাক। এখানে একটা কথা বলা জরুরি। RCT কিন্তু অভিজিৎ বাবু এস্থার ডুফলোদের আবিষ্কার নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য বহু যুগ ধরেই ইঁদুর এবং মানুষ- দুইয়ের ওপরেই হাজার হাজার RCT হয়েছে এবং হচ্ছে। এমন কি বিভিন্ন আর্থসামাজিক ফলাফলে টিকাকরণের বা অন্যান্য জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের প্রভাব পড়ে কী না- এই ধরণের কাজও চিকিৎসাবিজ্ঞানে হয়েছে। উদাহরণ বাংলাদেশের মতলব উপজেলা, যেখানে সেই ৭-এর দশক থেকে আমেরিকার চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা RCT করছেন। অভিজিৎ-এস্থাররা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই টেকনিটিকে অর্থনীতিশাস্ত্রে ব্যবহার করেছেন। তা ছাড়া এটাও বলা প্রয়োজন যে অর্থিনীতিশাস্ত্রে এক্সপেরিমেন্টের ব্যবহারও নতুন নয়। এক্সপ্রেমিন্টের জন্যই এর আগেও নোবেল দেওয়া হয়েছে। ২০০২ সালে ভার্নন স্মিথ, এবং ২০০৭-এ হারউইক্স, মায়ার্সন, এবং অভিজিৎ বাবুর পিএচডি সুপারভাইসাইর মাস্কিন নোবেল পান “মেকানিজম ডিজাইন”-এর জন্য যা মূলত গেম থিওরির বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে প্রমাণ করার উপায় বাতলায়। তবে অভিজিৎবাবুদের কাজের বৈশিষ্ট হলো যে তার প্রভাব বেশি সংখ্যক মানুষের ওপর পড়বে কারণ তাঁদের অধিকাংশ কাজই দরিদ্র জনগণকে নিয়ে।

অভিজিৎবাবু-এস্থার-ক্রেমারকে নোবেল দেওয়া নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ সমালোচনাও করেছেন। সমালোচনাটা তিন জন ব্যক্তিকে নয়, তাদের কাজ অর্থাৎ RCT নিয়ে। RCT-র কিছু সমস্যা আছে এটা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন। এই সমস্যার কিছু তাত্বিক আর কিছু ব্যবহারিক। মূল তাত্বিক সমস্যা যেটা সেটার পোশাকি নাম হলো “এক্সটার্নাল ভ্যালিডিটি”। আগেই বলেছি যে RCT ইভেন্টের সমস্যাগুলিকে অতিক্রম করে একটা সমজাতিগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, তাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। অর্থাৎ এমন একটা জনগোষ্ঠীকে তাঁরা বেছে নেয় যাঁরা আর্থসামাজিক দিক দিয়ে একরকমের। এই জনগোষ্ঠী যতটা এক রকমের হবে ততটাই RCT-র থেকে পাওয়া সিদ্ধান্তগুলো শক্তিশালী হবে। একে বলা হয় “ইন্টারনাল ভ্যালিডিটি”। কিন্তু মুশকিল হলো যে কোনো জনগোষ্ঠীর সবাই যদি খুব এক ধরণের হয় তখন দেখা যায় যে সেই গোষ্ঠী খুবই ভিতরমুখী, তাদের সাথে বাইরের দুনিয়ার সম্পর্ক ততই ক্ষীণ। বোধয় সব থেকে সমজাতীয় জনগোষ্ঠী হবে আন্দামানের সেন্টিনেলরা যাদের সাথে বাইরের দুনিয়ার কোনো সম্পর্কই নেই হাজার হাজার বছর ধরে, তাদের সকলে নিশ্চই খুব এক রকম ভাবে ভাবনাচিন্তা করে। যাই হোক, এবার সমস্যাটা হলো যে একটা জনগোষ্ঠী যতটা সমজাতীয় হবে ততটাই তাদের ওপর RCT করে পাওয়া সিদ্ধান্তগুলো ওই গোষ্ঠীর বাইরে অচল হবে কারণ বৃহত্তর জগতে পাশাপাশি দুটো গ্রামের মধ্যেও গোষ্ঠীগত তফাৎ থাকে। তাই এই জাতীয় RCT থেকে পাওয়া ফলাফল যে বৃহত্তর জগতের মানুষের আচার ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কাছে নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচন করবে- এমন বলা খুব মুশকিল। একেই বলে এক্সটার্নাল ভ্যালিডিটি দুর্বলতা। ইন্টারনাল ভ্যালিডিটি যত শক্তিশালী হয় এক্সটার্নাল ভ্যালিডিটি ততই দুর্বল হয়ে পড়ে। আফ্রিকার মরুভূমিতে বসবাসকারী এক গোষ্ঠীর মধ্যে শুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা তাদের অর্থনৈতিক ফলাফলের ওপর যতটা প্রভাব ফেলা যায় ততটা হয়তো তাদের থেকে মাত্র কয়েকশো মাইল দূরে কঙ্গো নদীতীরে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর ওপর ফেলা যাবে না। এটা একটা মৌলিক সমস্যা RCT-র। RCT-র আরেকটি তাত্বিক সমস্যা হলো যে এই পদ্ধতিতে হয়তো জানা যায় যে কোন ট্রিটমেন্ট প্রভাব ফেলে আর কোনটা ফেলে না, কিন্তু কেন সেরকম সেই নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এঁরা চুপ থাকেন। এই নিয়ে আমার অগ্রজ এবং বন্ধু, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একটা চমৎকার লেখা লিখেছিলেন ফেসবুকে। উনি অভিজিৎ এস্থারের আফ্রিকার নাইজেরিয়া নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্টের উদাহরণ দিয়েছিলেন যেখানে ওঁরা RCT করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে স্কুলের মেয়েদের অপ্রাপ্তবয়সে গর্ভবতী হওয়া আটকানোর ক্ষেত্রে জামাকাপড়ের শালীনতা বেশি কার্যকরী, যৌনশিক্ষার থেকে। প্রবীরদা বলছেন যে এর পেছনে যে কার্জকরণ রয়েছে সেটাকে যদি সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা না করা হয় তাহলে এই সিদ্ধান্তকে আরেকটু টেনে হিজাব অথবা ঘোমটা প্রথাকে সমর্থন করার দিকে যায়। এরই সম্পর্কিত আরেকটা সমালোচনা অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ করেছেন, যা হলো কোন ট্রিটমেন্ট কাজ করে আর কোনটা করে না সেটা হয়তো RCT বলতে পারবে কিন্তু কোন ট্রিটমেন্ট কাজ করা উচিত এবং কেন তা করছে না সেই সম্পর্কে RCT কিছু বলে না। অভিজিৎ বাবু রোশান কিশোরের সাথে সাক্ষাৎকারে এই সমালোচনা স্বীকার করে নিয়েছেন এবং বলেছেন যে RCT-র ক্ষমতা সীমিত সেটা বুঝতে হবে। এ ছাড়া কিছু ব্যবহারিক সমালোচনা আছে, যেমন RCT-গুলো যেহেতু গবেষক এবং এনজিও দ্বারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফান্ডেড তাই তারা যে ট্রিটমেন্টের প্রভাব নিয়ে কাজ করে থাকে তাও খুব সীমিত। এঁদের যা ফান্ড থাকে তা দিয়ে কয়েকটা গ্রামে মশারি বিলি করা বা টিকা দেওয়া বা শুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা অবধি যাওয়া যায় কিন্তু বড় ধরণের প্রজেক্ট যেমন স্বাস্থ্য বীমা অথবা এনরেগার মত প্রকল্প নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে RCT-র গবেষণা সীমিত থাকে ছোট ছোট, কম খরচসাপেক্ষ ট্রিটমেন্টেই। এ ছাড়া অপর একটি সমালোচনা হলো যে একটা জনগোষ্ঠীকে দুটো ভাগে ভাগ করে এক্সপেরিমেন্টের স্বার্থে একদলকে কিছু একটা দেওয়া এবং অপর দলকে কিছু না দেওয়ার মধ্যে এক ধরণের বৈষম্য তৈরী হয়।

এত সমালোচনা সত্বেও এটা অনায়াসে বলা যেতে পারে যে RCT অর্থনীতিবিদ্যায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে এবং অনেক প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। হয়তো তা সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ নয়, কিন্তু অন্যান্য পথে যাতে পথভ্রষ্ট না হয়ে যায় কেউ তা RCT অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here