খিলঞ্জিয়া ইস্যু ও অসম-সিলেট সম্পর্ক : একটি নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা

0

‘বরাকি’ শব্দটি সম্ভবত প্রথম ব্যবহৃত হয় হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অধিবেশনে। তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী শহিদুল আলম চৌধুরি-ই সম্ভবত প্রথম এই ‘বরাকি’ শব্দটি ব্যবহার করে অসমিয়া ভাষার সঙ্গে একটা সামঞ্জস্যতা খোঁজার আপাত চেষ্টা করেছিলেন। মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, অসম সাহিত্য সভাকে কাজে লাগিয়ে হাইলাকান্দি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা! তিনি সফল হয়েছিলেন! এটা ছিল রাজনৈতিক কৌশল! বিষয়টির এখানেই ইতি ঘটেছিল।

ইদানীং ‘বরাকি প্রবাদ’ বলে বিভিন্ন প্রবাদ দেখি এফবিতে। এগুলোর কোনও গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি নেই। ছিলটি (সিলেটি) প্রবাদকেই ইদানীং ‘বরাকি প্রবাদ’ বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে! এতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। আমি আগেও এই প্রবণতার প্রতিবাদ করেছি।

“সিলেট : কাব্যের উপেক্ষিতা” এই শিরোনামে আমার লেখা প্রবন্ধ একাধিক গ্রন্থ ও স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়েছে ইতিপূর্বে। অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য ও স্বপ্না ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ “আমাদের চিন্তাবিশ্ব” সংকলনেও লেখাটি আছে। “নমামি কুশিয়ারা” উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মরণিকায়ও এরকম একটি লেখা আছে। সেখানে ইতিহাসভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে।

“সিলেটি” একটি ঐতিহ্য। আর্যরা যেমন আর্য বলতে শ্লাঘা বোধ করেন, তেমনই, সিলেটিরাও নিজেদের “সিলেটি” বলতে শ্লাঘা বোধ করেন! সে তিনি করিমগঞ্জে থাকুন আর কানাডায় থাকুন! আমেরিকায় থাকুন কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় থাকুন। তিনি সিলেটি পরিচয় গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেন! রাজনৈতিক কারণে সিলেটিরা বিচ্ছিন্ন হলেও মনের ভূগোল কিন্তু বদলায়নি!

১৮৭৪ সালে যখন নতুন চিফ কমিশনার শাসিত আসাম প্রদেশ সৃষ্টি হয়, তখন কাছাড়, গোয়ালপাড়া, সিলেট ইত্যাদি অঞ্চলকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়। তখন “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” নামে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকা হয় রাজধানী। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের নির্দেশে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। কার্যকরী হয় ১ এপ্রিল ১৯১২ সালে। সিলেট আসামের একটি জেলা হিসেবে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। করিমগঞ্জ তখনও সিলেটের মহকুমা। করিমগঞ্জ মহকুমা হয় ১৮৭৮ সালে। সিলেট আসামের একটি জেলা। দেশভাগের সময় সিলেটে গণভোট হয়। গণভোটে করিমগঞ্জসহ সমগ্র সিলেট পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ৬ ও ৭ জুলাই হয় গণভোট। কিন্তু ১৭ আগস্ট করিমগঞ্জের সাড়ে তিন থানা ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ নেতৃবর্গ তখন পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত! করিমগঞ্জ তথা সিলেটের মানচিত্রে কাঁচি চালালেও অখণ্ড সিলেটি সত্ত্বা এখনও বহাল আছে! সুতরাং করিমগঞ্জের মানুষ ‘ছিলটি’ (সিলেটি) কি না, এ বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই!

‘কাছাড়ি’ বা ‘বরাকি’ বলে কোনও ভাষার অস্তিত্ব ছিল না কোনওদিন। এখনও নেই। সিলেটি ভাষাকে একটু অদলবদল করে তো আর কাছাড়ি বা বরাকি ভাষা সৃষ্টি করা যাবে না!

আর নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী আমি সিলেটিকেও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সমর্থন করি না। প্রমিত বাংলা-ই হোক আমাদের শিক্ষার মাধ্যম। বাংলা ভাষা নিজে বিপন্ন। একে সিলেটি/ কাছাড়ি বলে ভাগ করে আর বিপন্ন করা কোনও মানে হয় না।

তবে, অন্যত্র বিতর্ক আছে। সেখানে সেই বিতর্ক করা যাবে। কারণ, সুনীল গাঙ্গুলি সাহিত্য একাডেমির সভাপতি থাকাকালীন লন্ডনে এক সুধী সমাবেশে আমার “বাংলা যে দেশে রাষ্ট্রভাষা” গ্রন্থে উল্লেখিত বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহিদ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, বরাক উপত্যকার মানুষ আঞ্চলিক ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন! এরা বিচ্ছিন্নতাবাদী! আমি এর প্রতিবাদও করেছিলাম তখন।

যা-ই হোক, কাছাড়ি/বরাকি বলে বাংলা ভাষাকে আর বিপন্ন না-করতে অনুরোধ করি। তবে, সিলেটি একটি ঐতিহ্য! একে খাটো করার উপায় নেই! করিমগঞ্জ সিলেটি ঐতিহ্যের একশ ভাগ হকদার! অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিলেটি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম না-হলেও প্রাণের ভাষা থাকবে চিরকাল! সিলেটির মধ্যে যে মাধুর্য ও প্রাণভোমরা আছে, তা প্রমিত বাংলায় নেই! এরপরও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রমিত বাংলা-ই কাম্য।

আজকের পত্রিকায় দেখলাম, ‘খিলঞ্জিয়া’র ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়েছে ১৯৫১ সালকে। অসমের সঙ্গে সিলটিদের সম্পর্ক আবহমান কালের। ১৮৫৪ সালে যখন বিহার, উরিষ্যাসহ ব্যঙ্গল প্রভিন্স বা বৃহত্তর বঙ্গদেশ গঠিত হয়েছিল, আসাম, পূর্ববঙ্গও সেই বৃহত্তর বঙ্গদেশের অঙ্গ ছিল। সিলেটও অপরিহার্যভাবে আসামের সঙ্গে বঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৭৪ সালে বৃহত্তর বঙ্গদেশকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য আয়তন ও জনসংখ্যা হ্রাস করার লক্ষ্যে কুড়ি লক্ষ জনসংখ্যাসমেত আসামকে বঙ্গদেশ থেকে পৃথক করা হয়েছিল। সিলেট তখনও নতুন চিফকমিশনারশাসিত আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালাজ্বর ও অন্যান্য কারণে নতুন সৃষ্ট আসাম প্রদেশে স্বনামধন্য, দক্ষ কোনও সরকারি আধিকারিক কাজে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করতেন। সেই বিপদসঙ্কুল নতুন সৃষ্ট প্রদেশকে সিলেটিরাই সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা করে গড়ে তুলেছিলেন!

১৯০৫ সালে যখন প্রশাসনিক সুবিধার্থে বৃহত্তর বঙ্গদেশকে আবারও ভাগ করা হয় “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” প্রদেশ নাম দিয়ে, তখনও সিলেট আসামেরই একটি বর্ধিষ্ণু জেলা হিসেবে নতুন সৃষ্ট “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ার পর আসাম সিলেটসহ পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। সুতরাং অসমের সঙ্গে সিলেটের আবহমান কালের সম্পর্ক শুধু মৌখিক নয়; ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বটে। অসমের সমৃদ্ধির নেপথ্যে সিলেটিদের অসামান্য অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

[একান্তই মতামত লেখকের, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here