মহিমান্বিত মাস রমযান

0
ছবি : সংগৃহিত

মহিমান্বিত মাস রমযান

মু.নূরুল হুদা

আরবী, বাংলা, ইংরেজী ও অন্যান্য সকল ক্যালেন্ডার মতে মাসের সংখ্যা বারটি। বার মাসের এ হিসেব আধুনিক বিজ্ঞান খুব বেশিদিন পূর্বে আবিষ্কার করতে না পারলেও মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে মাসের সংখ্যা বার হবার দ্ব্যর্থহীন ঘোষনা দিয়ে রেখেছেন আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে। আল্লাহ বলেছেন-“নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হতে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং, এর মধ্যে তোমরা নিজেদের মধ্যে অত্যাচার করোনা” (তাওবা-৩৬)। সময় ও গণনার বিবেচনায় সকল দিন ও মাস সমান হলেও মর্যাদা ও মহিমার বিচারে কিছু কিছু দিন-মাস স্ব-মহিমায় ভাস্বর, যেগুলোর জন্য আলাদা ব্যখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।
পবিত্র মাহে রমযান সেরুপ এক মহাসম্মানিত বরকতপূর্ণ মাস। রহমত,বরকত আর নাজাতের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর বিশ্ব মুসলিমের নিকট এ মাস হাজির হয়। এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানগন তাদের ঈমানী চেতনা জাগ্রত করে ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট প্রিয় বান্দা হবার সুযোগ লাভ করে। এ মাসে কবরের আযাব বন্ধ করে দেয়া হয়, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহকে বন্ধ করা হয়, প্রতিটি আমলের সওয়াব সত্তর গুণ বৃদ্ধি করা হয়। রমযান মাসে সমস্ত কর্মকান্ড একটি সুনির্দিষ্ট রুটিনমাফিক পরিচালিত হয়। ভোররাতে সেহরি গ্রহন,সালাতুল ফজর আদায়, দিনশেষে নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার এরপর তারাবীহ্ এ সকল কিছুই একটি সুশৃঙ্খলতার প্রমাণবহ। সারাবছরই হাফেজে কুরআনগণ সম্মানের পাত্র তবে, এ মাসে তাদের কদর বহুগুণে বেড়ে যায়। মসজিদে-মসজিদে খতম তারাবীর আয়োজন করা হয়। এ মাসের মহিমান্বিত হবার আরেকটি বড় প্রমাণ হলো, মানুষের মধ্যে রমযান মাসে অত্যাধিক খোদাভীতি লক্ষ্য করা যায়। কোন মন্দ বা গুনাহের কথা-কাজ সংঘটিত হতে শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করে দেয়া হয় এটি রমযান মাস। কোথাও কোন ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক সংঘাত বা মারামারির সম্ভাবনা দেখা দিলে রমযানের পবিত্রতার খাতিরে তারা বিরত থাকেন।
এ মাসের রয়েছে এমন কিছু বিশিষ্টতা যা অন্য মাসসমূহের নেই। সেসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যতই চিন্তা করা যায় ততই এ মাসের গুরুত্ব ও মহিমা প্রকাশিত হয়। অন্য কোন মাস নয় বরং বার মাসের মধ্যে একমাত্র রমযানের কথাই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানেই এ মাসের মর্যাদা প্রতীয়মান। আল্লাহর ঘোষণা-“রমযান মাস, এ মাসেই আমি পবিত্র কুরআনকে নাযিল করেছি যা সকল মানুষের জন্য হেদায়াত এবং যা হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। সুতরাং, তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে সে যেন রোযা রাখে” (বাক্বারাহ-১৮৫)।
প্রথমত : আল্লাহ পাক স্বয়ং পবিত্র কুরআনে এ মাসের বৈশিষ্ট্য ঘোষনা করেছেন। এটা ঠিক যে, কুরআনে আশহুরে হুরুমের কথাও উল্লেখ আছে। তাতে যে চারটি মাসের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো- রজব, জিলক্বদ, জিলহজ¦ ও মুহাররম । চার সম্মানিত মাস বলতে এ মাসগুলিই সুবিদিত এবং হাদীসের বর্ণনা অনুসারে এখানে এ চার মাসকেই বোঝানো হয়েছে, কিন্তু এ মাসসমূহের নাম কুরআনে উল্লেখিত হয়নি।
দ্বিতীয়ত : এ মাসের সাথে ইসলামের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে, আর সেটি হলো রোযা পালন। এ রোযা জান্নাত লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম। যেমন, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনল, নামায কায়েম করল, যাকাত আদায় করল, রমযানের রোযা পালন করল; আল্লাহ তায়ালার কর্তব্য হলো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো। (বুখারী)
তৃতীয়ত : রমযান মাসে রয়েছে লাইলাতুল ক্বদর। এ রাত্রির ইবাদত আল্লাহর নিকট এত বেশি প্রিয় যে, তিনি সে রাতে তাঁর অসংখ্য পাপী বান্দাহকে ক্ষমা করে থাকেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম । সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনী উষার আবির্ভাব পর্যন্ত”। (সুরা আল-ক্বদর)
চতুর্থত : গুনাহ হতে ক্ষমা লাভের মাস। যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসূল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমযান এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। (তিরমিযি) সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।
পঞ্চমত : রমযান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম বলেছেন : রমযান জাহান্নাম মাসের প্রথম রজনীর যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জীনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এমাসে আর তা খোলা হয় না।
ষষ্ঠত : রমযান ধৈর্য্য ও সবরের মাস । এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদী ও অন্যান্য সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন সময়ে করেন না। এমনিভাবে রোযা পালন করে যে ধৈর্য্যরে প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদাতে পাওয়া যায়না। আল্লাহ রাব্বুর আলামীন বলেছেন : ধৈর্য্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেয়া হবে। (সূরা যুমার,আয়াত-১০)।
সপ্তমত : সহীফাসমূহ নাযিল। এ রমযানেই অধিকাংশ সহীফা বিভিন্ন নবীর উপর নাযিল হয়েছে। রাসুলে করীম (সাঃ) বলেছেন, হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সহীফা রমযান মাসের ১লা তারিখ নাযিল হয়েছিল। আর রমযানের ৬ তারিখে তাওরাত, ১৩ তারিখে ইঞ্জিল নাযিল হয়েছে। হযরত জাবের (রাঃ) এর রেওয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে,‘যবুর’ রমযানের ১২ তারিখে এবং ইঞ্জিল ১৮ তারিখে নাযিল হয়েছে। (ইবনে কাসিরের বরাতে তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন)
রমযান মাস এত বেশি মর্যাদাপূর্ণ বলেই নবী করীম (সা:) রজব মাসের পূর্বে দুয়া করতেন এটা বলে-“হে আল্লাহ্, তুমি রমযান পর্যন্ত পৌছিয়ে দাও”। অর্থাৎ, নবী সা: সহ সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম রমযানের প্রত্যাশায় সারাটা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন প্রভূর রং এ ঢেলে সাজাতে রমযানের ভূমিকা অপরিসীম । মহিমান্বিত এ মাসে মানুষ সমস্ত গুনাহের কাজ থেকে বিরত হয়ে নিমগ্নচিত্তে এক আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিবিষ্ট করে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে রমযানের বরকত ও ফজীলত পরিপূর্ণভাবে গ্রহনের তাওফীক দান করুন।
লেখক –
বি.এ (সম্মান), এম.এ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সাউথ এশয়িান ইয়ূথ অ্যাসোসয়িশেন- ঝঅণঅ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here