লিবিয়ার পরিস্থিতি: কি ঘটছে? কেন ঘটছে? কিভাবে ঘটছে? কি তার পরিণতি?

0

হিফজুর রহমান খাজাম: আফ্রিকার মধ্যে তেলসমৃদ্ধ প্রথম, প্রাকৃতিক সম্পদে চতুর্থ এবং সোনা উৎপাদনে বিশ্বের ২৫টি দেশের মধ্যে একটি দেশ হল লিবিয়া। উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে মিশর, দক্ষিনে চাঁদ, পশ্চিমে আলজেরিয়া। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত এই দেশ। ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে আরবদের ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে লিবিয়া একটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৬ শতকে উসমানিয়া তুর্কিদের দখলে চলে যায় লিবিয়া।

১৯১১-১২ খ্রিস্টাব্দে ইতালিয়ানরা লিবিয়া দখল করে। ২০ বৎসর ধরে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে নিহত হন ওমর মোক্তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র জোটের হাতে পরাজি হয় ইতালি। লিবিয়ার দখল নেয় ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড। দুই মিত্র শক্তি তাদের মধ্যে ভাগ করে নেয় লিবিয়াকে।

১৯৫১ সনে সম্রাট ইদ্রিস আল মনসূরির হাতে লিবিয়া স্বাধীন হয়। তারপর ২৭ বছর বয়সী কর্নেল মোহাম্মদ গাদ্দাফির হাতে বিনা রক্তপাতে এক সামরিক উত্থানের মাধ্যমে সম্রাট মনসূরির পতন হয়। কর্নেল গাদ্দাফি লিবিয়ার সর্বেসর্বা হয়ে যান। তার শাসনামলে নাগরিকরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা উপভোগ করলেও তেলপিপাসুরা বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিকে হাতিয়ার করে গাদ্দাফিকে উৎখাত করতে সব প্রচেষ্টা চালায় এবং ২০১১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহীদের হাতে তিনি নিহত হন।

শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ, আর এই গৃহযুদ্ধ চলে ২০১৫ পর্যন্ত। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় লিবিয়া। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সমর্থনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গভমেন্ট অফ ন্যাশনাল একোর্ড’ (GNA)। ফাইয়াজ আল সিরাজ হন সরকার প্রধান, জাতিসংঘ এই সরকারকে সমর্থন করে। খলিফা হাফতার তার ‘লিবয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ (LNA) এই সরকারের বিরোধিতা করে ক্ষমতার দখল নিয়ে দেশের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময় যুদ্ধ চালাতে থাকে।

ফ্রান্সের রাষ্টপতির উদ্যোগে প্যারিসে এক বৈঠকের আয়োজন করা হয় উভয়পক্ষ যুদ্ধবিরতি ও ২০১৮ তে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেও সফল হতে পারেননি। ২৯-০৫-২০১৮ তে প্যারিস সম্মেলনে ফোয়াজ আল সিরাজ, যুদ্ধবাজ খলিফা হাফতার, আগিলা সালে, খালেদ আল মিশ্রি যৌথ বিবৃতিতে ডিসেম্বরে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেও চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবাজ হাফতার তাৎক্ষণিক চিন্তার পরিবর্তন করে এই নির্বাচনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান।

১২, ১৩ নভেম্বর ২০১৮তে ইতালির পালেরমো শহরে এক শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করা হয় কিন্তু এই সম্মেলনও বিফল হয়ে যায়। ১৪-৪-২০১৯ এ গডেমস সম্মেলনেও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও যুদ্ধবাজ হাফতারের বোমা আক্রমণে তা বিফল হয়।

১৩ জানুয়ারি ২০২০ সাময়িক একটি শান্তি চুক্তির আশায় তুর্কির উদ্যোগে মস্কোয় এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। কিন্তু যুদ্ধবাজ খলিফা হাফতারের সভা ত্যাগের মাধ্যমে এই সময় সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিও বিফল হয়। যদিও রাষ্ট্রসংঘ সমর্থিত GNA প্রধান ফায়াজ আল সিরাজ এই শান্তিচুক্তিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এই সময় তুর্কির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে কে যুদ্ধ চায় আর কে যুদ্ধ চায় না এটাই বৈঠকগুলোতেকে বুঝা যায়।

যুদ্ধবাজ খলিফা হাফতার হলো আমেরিকার একজন নাগরিক এবং সিআইএ’র একজন সম্পদ। এই হাফতারের হাতে লিবিয়ার হাজার হাজার অসামরিক সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। বেনগাজি শহরসহ বিভিন্ন তেল সম্পদ সমৃদ্ধ শহরের সাধারণ নাগরিকদের হত্যা ও গৃহত্যাগ করাতে বাধ্য করেছে এই হাফতার। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গোবমেন্ট অফ ন্যাশনাল একর্ড GNA কে উৎখাত করতে সব ধরণের সন্ত্রাসী কাজ করেছে এই হাফতারের LNA বাহিনী।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল যে বিশ্বের গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী ফ্রান্স, রাষ্ট্রসংঘ সমর্থিত সরকারের বিরোধী একটি সন্ত্রাসী গুষ্টিকে ধারাবাহিক ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে তারা। কারণ হলো লিবিয়ার তেল, গ্যাস এবং স্বর্ণ সম্পদের ওপর দখলদারি নেওয়া।

অন্যদিকে সৌদি আরব, ইউএই, এবং মিশর আরব বিশ্বে কোন গণতান্ত্রিক কল্যাণকামী সরকার চায় না, তাদের ইচ্ছা হল আরবের সম্পদগুলো কয়েকটি পরিবারের হাতেই থাকতে হবে বা আরবের সম্পদগুলো কেবল কয়েকটি পরিবারতান্ত্রিক মানুষের কাছে থাকতে হবে। তাদের কাছে হাফতারের মত একজন ডিক্টেটর এর প্রয়োজন। রাশিয়াও NATO এলাকায় তার অবস্থান মজবুত এবং আরবের তেল সম্পদের ওপর ভাগ বসাতে হাফতারের অবস্থান মজবুত করতে চায়।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ওয়ারলি কেনার্ড তার আর্টিকেলে লিখেছেন যে রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ই হলেন একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি সততার সঙ্গে লিবিয়ার সমস্যায় কাজ করে যাচ্ছেন কেননা যেখানে জাতিসংঘ সমর্থিত একটি সরকারকে উৎখাত করতে সৌদি আরব, ইউএই, মিশর, ইউরোপের ফ্রান্স এবং রাশিয়া সহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশ হাফতারের মত একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠিকে সামরিক এবং আর্থিক সাহায্য করে যাচ্ছে। সেই সময় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পূনর্গঠনের জন্য জাতিসংঘ সমর্থিত একটি সরকারকে সার্বিক সাহায্য করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here