খেলা, যাকে বলে, বেশ জমে গেছে

0
নাগরিকত্ব বিল বিরোধী আন্দোলনের এক মুহূর্ত।ফাইল ফটো।

বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জে, অসম সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী, হিমন্তবিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, নভেম্বরে সিএবি বিল আসছে। ব্যস, হিন্দুদের আর ভয় নেই। জনসভার যেটুকু ছবি দেখেছি, সবারই বেশ হাসি-হাসি মুখ। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, ‘এই এনআরসি বিজেপি মানছে না। আমরা সুপ্রিম কোর্টে এটাই বলব, বিজেপি রিজেক্ট দিস এনআরসি। সিএবি মানে নাগরিকত্ব বিল আনা হবে নভেম্বরে। ভারতের সব হিন্দুর দায়িত্ব বিজেপির। এনআরসি-তে সব হিন্দুর নাম উঠতেই হবে।’

এর পর অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন, ‘উত্তর-পূর্বের সব রাজ্য তথা অসমের যে স্পেশাল স্টেটাস, তাতে কোনো ক্ষতি হবে না। অসমিয়া মানুষ চায় অসমে হিন্দু বাঙালি থাকুক। পরিষ্কার বলছি, পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে ৩১ অক্টোবর, ২০১৪ পর্যন্ত যেসব হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-শিখ-জৈন ভারতে প্রবেশ করেছেন সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলে তাঁরা সবাই সুরক্ষিত থাকবেন। নাগরিকত্ব পাবেন, কোনো চিন্তা করতে হবে না।’
এবং তাঁর বক্তব্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই, ‘পশ্চিমবঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, আগে সিএবি, পরে এনআরসি। সেটাই হবে। আর এই এনআরসি নিয়ে ভাববেন না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহজির নেতৃত্বে গোটা দেশে এনআরসি হবে, সেটাই হবে প্রকৃত এনআরসি। আমাদের মানুষ যতক্ষণ না নিরাপদ হয়, এনআরসি শুদ্ধ হবে না।’

ব্যস, মোটামুটি এটুকুই। কিন্তু প্রশ্ন তো অনেক। উল্লেখিত তিনটি দেশ থেকে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে ভারতে এসেছেন, এটা কীভাবে প্রমাণ হবে? কোন দেশ এটা স্বীকার করবে যে ‘আমরা অত্যাচার করেছি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছেন?’ ওই বিলের আধারে যত মানুষ আবেদন করেছেন, সংখ্যাটা অত্যন্ত কম, শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার সঠিক বলতে পারবেন, এবং অধিকাংশই এখনকার পাঞ্জাবে বসবাস করেন, অর্থাৎ এসেছেন পাকিস্তান থেকে। অসম বা উত্তর-পূর্বে এই সংখ্যাটা কত? যতদূর জানি, ১০০ থেকেও কম। তাহলে কি ধরে নিতে হবে নতুন রূপে সিএবি আনা হবে লোকসভায়?

বাকি ভারতের মনে না থাকতে পারে, আমাদের মনে আছে, সিএবি নিয়ে কতটা শোরগোল হয়েছে অসমে। ওই বিলের প্রতিবাদে সরকার থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছিল অসম গণ পরিষদ (অগপ), গুয়াহাটির রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে অগপ, আসু, কৃষক মুক্তি মোর্চার। সেই সিএবি যদি আইনে পরিণত হয়, হিন্দুদের, অসমের ক্ষেত্রে বাঙালি হিন্দুদের, আরও একবার কি আমরা সাক্ষী হব ১৯৭৯-৮৩-র সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর? যখন শুধু বাংলাভাষায় কথা বলার জন্যই খুন হতে হয়েছে, মার খেতে হয়েছে, ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে। সিএবি-র সূত্রে সেই দিনগুলোই কি ফিরিয়ে আনতে চায় বিজেপি?

তবু বিজেপি-কে এসব বলতেই হবে। কেননা সিএবি আইন না হলে, ১৯৪৯ সালের ২৬ জুলাই ভিত্তিবর্ষ করে গোটা ভারতে এনআরসি হলে ত্রিপুরার বাঙালির ৯৫ শতাংশ অনাগরিক হবেন, পশ্চিমবঙ্গেও অন্তত দুকোটি মানুষ অনাগরিক হবেন, গোটা ভারতে এই সংখ্যাটা হয়তো পাঁচকোটিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কেননা শুধু তো বাঙালি নয়, শ্রীলঙ্কা থেকে আগত তামিলরা আছেন, পাকিস্তান থেকে আগত পাঞ্জাবিরা আছেন, আর আছেন উপযুক্ত নথিপত্রহীন প্রকৃত ভারতীয়রা। যাঁরা মুসলমান। এটা একটা দিক।

অন্যদিকটা হল, ধর্মের ভিত্তিতে এরকম বিল যে অসাংবিধানিক সেটা কোনো বিজেপি নেতা উল্লেখ করছেন না। বিল হয়তো পাস হয়ে গেল, পরদিনই সুপ্রিম কোর্টে মামলা হবে, বাতিল হবে বিল। অবশ্য সংবিধান সংশোধন হলে, ভারত রাষ্ট্র পিওপল রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া থেকে হিন্দু রিপাবলিক হয়ে গেলে, আলাদা কথা।

অসম তথা উত্তর-পূর্বের বিজেপি নেতা হিমন্তবিশ্ব শর্মার কথা বাদ দিয়েই বলা যায়, বিজেপি অন্যান্য ইস্যুর মতো এনআরসি-কেও জাতীয় সুরক্ষার দিক থেকে প্রচার করবে। অসমের জাতীয়বাদী সংগঠনগুলো যেমন বলে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি আছে অসমে, ঠিক তেমনই বিজেপি এবার শুরু করবে বলতে, কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে ভারতে। এদের তাড়ানোর একটাই উপায় এনআরসি।

খুব ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে বিজেপির যুক্তি যে অসার বোঝা যায়। এই মুহূর্তে মুসলমান জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ। ১৯৪৯ সালের ২৬ জুলাই ভিত্তিবর্ষ করে গোটা ভারতে এনআরসি হলে, যা অসম্ভব, খুব বেশি হলে ১-২ শতাংশ মুসলমান চিহ্নিত হবেন অনাগরিক হিসেবে। এঁরাই তাহলে বিপদ? দেশের পক্ষে বিপজ্জনক?

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই এনআরসি নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, আপত্তি জানিয়েছেন। গোটা ভারতে এনআরসি ঘোষিত হলে প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হবেন তামিলনাড়ু ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীরাও। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কড়াইয়ে ভাজা হবে ভারতের মানুষকে এনআরসির নামে? আমরা কি সবই মেনে নেব, নিরুচ্চারে, নীরবে? পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তো জবাব দিতেই হবে কোনো একদিন, তখন?

পিকচার আভি বি বাকী হ্যায়…‌

বাসব রায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here